ফারাক্কার বিপরীতে বাংলাদেশ বাঁধ নির্মাণ করলে কত টাকা লাগবে?

বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে গঙ্গা নদীর উপর ১৯৬২-১৯৭৫ সালে ২.৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফারাক্কা বাধ নির্মাণ করা হয়েছিলো।

তৎকালীন সময়ে ভারত সরকারের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করতে লেগেছে প্রায় ২৮০ মিলিয়ন ডলার। তখন ১ ডলার সমান ছিলো প্রায় ৭.৮ টাকা। সুতরাং ২৮০ মিলিয়ন ডলারকে টাকায় রুপান্তর করলে দাঁড়ায় ২১৮.৪ কোটি টাকা। তাহলে আমরা বলতে পারি ১৯৬২-৭৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ভারত সরকারের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করতে প্রায় ২১৯ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে।

বর্তমানে এই ফারাক্কা বাঁধ আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এই বাধ আমাদের দেশকে মরুভূমিতে পরিণত করে। আবার বর্ষার মৌসুমে দেশে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এই বাধ সৃষ্টির পর থেকে বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে একটা সময় বাংলাদেশ সরকারও পরিকল্পনা করেছিলো, যদি ফারাক্কা বাধের বিপরীতে গঙ্গার উপর আরো একটি বাধ নির্মাণ করা যায় তাহলে হয়তো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পুরোটা লাঘব করা সম্ভব। কিন্তু পরবর্তীতে এই পদক্ষেপের কার্যকরী ভূমিকা হয়তো কিছু কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় নি।

যদি বাংলাদেশ এখন ফারাক্কার বিপরীতে আরো একটি বাধ নির্মাণ করতে চাই, তাহলে কত টাকার বিনিময়ে এই বাধ নির্মাণ করা সম্ভব হবে? আমরা অনেকেই মনে করি- যেহেতু ফারাক্কা বাধ নির্মাণ করতে ভারতের মাত্র ২১৯ কোটি লেগেছে, তাহলে হয়তো আমাদেরও একই পরিমাণ টাকা লাগবে। আসলেই কি তাই? উত্তর হবে- না। চলুন তাহলে হিসাব করি, বাধ নির্মাণ করতে আমাদের কত টাকা লাগতে পারে।

বর্তমানে ১ ডলার= ৮৪.৭৫ টাকা
সুতরাং ২৮০ মিলিয়ন ডলার=২৩৭৩ কোটি টাকা

তাহলে কি বাধ নির্মাণ করতে আমাদের প্রায় ২ হাজার ৩ শত ৭৩ কোটি লাগবে? উত্তর হবে- না। বরং তার থেকেও অনেক বেশি টাকা লাগবে। কারণ-

ভারত যখন ফারাক্কা বাধ নির্মাণ করে তখন চাল ছিলো ১-২ টাকা কেজি, বর্তমানে চালের দাম প্রতি কেজি ৪০-৬০ টাকা (আগের থেকে ২০-৩০গুন বেশি);
তখন হয়তো শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিলো ২০-৩০ টাকা, বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি ৪০০-৬০০ টাকা (আগের থেকে ২০-৩০ গুন বেশি); তখন ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, আর্কিটেক্ট, এডমিনিস্ট্রেটরদের যে পরিমাণ টাকা দিতে হতো, বর্তমানে তাদের থেকেও কয়েকগুণ হতে পারে ১০০গুন বেশি টাকা দিতে হবে; বর্তমানে ইট, বালু, রড, সিমেন্টের দাম ষাটের দশকে যেমন ছিলো তার থেকে অনেক বেশি, তখন বিভিন্ন পণ্য, যন্ত্রপাতি পরিবহন করতে যেমনটা খরচ হত, বর্তমানে তার থেকে অনেক বেশি খরচ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাহলে বুঝতেই পারছেন শুধু ২৩৭৩ কোটি টাকা দিয়ে আমাদের বাধ নির্মাণ করা সম্ভব না। ফারাক্কার মতো আমাদের আরো একটি বাধ নির্মাণ করতে হলে ২ হাজার কোটির আরো কয়েকগুণ টাকা দরকার। বাধ নির্মাণ করতে হলে সবমিলিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লাগবে। যদি ফারাক্কার বিপরীতে বাধ নির্মাণ করতে মাত্র ২১৯ কোটি টাকা লাগতো, তাহলে সরকার ১টি না, প্রয়োজনে ফারাক্কার বিপরীতে কয়েকটি বাধ নির্মাণ করত। যেহেতু বাধ নির্মাণ খরচ অনেক বেশি, তাছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতি বলেও একটা কথা আছে, তাই ইচ্ছা থাকলেও ফারাক্কার বিপরীতে আমরা বাধ নির্মাণ করতে পারবো না। কারণ যে টাকা দিয়ে বাধ নির্মাণ করবো সেই একই টাকা দিয়ে আরো একটি পদ্মা সেতু নির্মান করা যাবে।

লেখক: রবিউস সানি

Facebook Comments

Related Articles