ভারতের উপর দিয়ে নেপালকে রেলপথে ট্রানজিট সুবিধা দিচ্ছে বাংলাদেশ

বিশ্বমানচিত্রে আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ ও নেপাল প্রায় সমান। অনেকেই সেটা মনে রাখতে দ্বিধায় পরে যায়। বিশ্বের ১৯৫ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের আয়তন ৯৪ তম এবং নেপালের ৯৫ তম।

যদিও বাংলাদেশের সাথে নেপালের কোনো সীমান্ত নেই তারপরও দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক যেন প্রতিবেশী দেশের চেয়েও অনেক উন্নত, অনেক গাঢ়। তাদের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কও অনেক শক্তিশালী।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে প্রথম ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের ৬টি রুটকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এই রুটগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে নেপালের পণ্য পরিবহণ দুরুত্ব অনেক বেশি। তাই পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নেপালের বেশি খরচ হচ্ছে। খরচ কমানোর জন্য নেপাল বাংলাদেশের কাছে দীর্ঘদিন থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহানপুর দিয়ে রেলপথে পণ্য পরিবহনে ট্রানজিট সুবিধা চেয়ে আসছিল।

তাছাড়া বর্তমানে নেপাল তাদের আমদানি-রপ্তানির একটি বড় অংশ সম্পন্ন করে ভারতের হলদিয়া বন্দর দিয়ে। তবে এক্ষেত্রেও পণ্য পরিবহণ দূরত্ব এবং আর্থিক খরচ অনেক বেশি হয়। সেই জন্য নেপাল ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের কাছে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে রেলপথে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রস্তাব দেয়।

তবে এই সকল ট্রানজিট সুবিধা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ভারত সফরে গেলেন, তখন তিনি রোহানপুর-সিঙ্গাবাদ রেলপথকে নেপালের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিলে ভারত সরকার সেটাতে সম্মতি জানায়। আর এতেই ভারতের ভূখন্ড ব্যবহার করে নেপালের সঙ্গে রেলপথে ট্রানজিট যোগাযোগ
সুবিধা সৃষ্টি হয়।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতের সম্মতি পাওয়ার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহানপুর রেলস্টেশনকে ৬টি রুটের অতিরিক্ত নতুন আরেকটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। খুব শীঘ্রই ট্রানজিট সংশোধনের প্রস্তাব যাচ্ছে মন্ত্রিসভায়।

নেপালকে এই ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার ফলে পণ্য পরিবহণের দূরত্ব কমে আসবে। যার ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ এক তৃতীয়াংশে নেমে আসবে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে, আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

মন্ত্রণালয় সুত্র আরও জানায়, রেল ট্রানজিটটি বাস্তবায়িত হলে নেপাল বঙ্গোপসাগর দিয়ে পণ্য আমদানি করে মোংলা বন্দরে খালাস করবে। এরপর সেটি খুলনা হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহানপুর স্থলবন্দরে পাঠানো হবে। পরে সেখান থেকে নেপালে পণ্য সরবরাহ করা হবে। এতে নেপালের পণ্য পরিবহণ ব্যয় কমবে। পাশাপাশি মোংলা বন্দর ব্যবহারের চার্জ এবং মাশুল ছাড়াও রোহানপুর পর্যন্ত দেশীয় যানবাহন ব্যবহার করে নেপালি পণ্য পরিবহণ বাবদ অর্থ পাবে বাংলাদেশ।

উল্লেখ্য গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৮.৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য নেপালে রপ্তানি করেছে, একই সময়ে আমদানি করেছে ১৮.১৩ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ এখন নেপালে পাটজাত পণ্য, ব্যাটারি, তৈরি পোশাক, ওষুধসহ বেশকিছু পণ্য রপ্তানি করছে। দিন দিন উভয় দেশের মধ্যকার বাণিজ্যক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এ অবস্থায় দুই দেশের মধ্যে রেলপথে ট্রানজিট সুবিধা কার্যকর হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যক সম্পর্ক আরো সম্প্রসারিত হবে।

লেখাঃ রবিউস সানি ( DefRes Writer’s Pannel)

Facebook Comments

Related Articles