উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার বিকল্প নেই

যদি কখনো বাংলাদেশের উন্নয়ন বৈষম্যের কথা বলা হয় তবে উত্তরাঞ্চল হবে প্রথম উদাহরণ। অন্য বিভাগগুলো থেকে পিছিয়ে উত্তরাঞ্চলের জেলা গুলো।

গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়। এই অঞ্চলের উন্নয়ন যেন দুর্ভেদ্য। বিগত ১০ বছরে উন্নয়ন হলেও সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা। সমাধান দিতে পারে কৃষি-ভিত্তিক শিল্প। দেশের উত্তরাঞ্চল দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সরকারি চাকরি, বিদেশে কর্মী প্রেরণ, জ্বালানি প্রাপ্তি, শিল্প, সাহিত্য, বিনোদনসহ সকল ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন। বর্ষায় বন্যায় প্রথম আঘাতটাই আসে এই অঞ্চলে। অথচ দেশের খাদ্য চাহিদার ৫০ শতাংশ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের ৭০ শতাংশ কাঁচামাল উত্তরাঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হয়। চট্টগ্রাম আর গাজীপুরের পর উত্তরাঞ্চলের জেলা গুলোই সবচেয়ে সমৃদ্ধ হবার কথা ছিলো। কৃষির এই স্বর্গরাজ্যে ইপিযেড এবং ছোটখাটো মেশিনারিজ ফেক্টরি ব্যতীত এখনো বড় আকারে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। এটি এক বিস্ময় বটে। অথচ এই সম্ভাবকে আমরা সঠিক পরিকল্পনা করে বাস্তবায়ন করে দেশের চেহারাই বদলে দিতে পারি।

মৌসুমি ফল থেকে শুরু করে শীতকালীন সবজি চাষ প্রচুর পরিমাণে জন্মায় এখানে। তাই উত্তরবঙ্গ হতে পারে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প অঞ্চল। শীতকালীন সবজি যেমন: গাজর, ফুলকপি, বেগুন, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি আলু ইত্যাদি প্রক্রিয়াকরণের কারখানা হতে পারে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ এসব ফসলের জন্য হিমাগার নিতান্ত অপ্রতুল। হিমাগারে সংরক্ষণ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়, কৃষকরা বেশির ভাগ সময় তা পুষিয়ে নিতে পারে না। দ্রুত পচনশীল সবজি প্যাকেটজাত করে বিপণন করে কৃষকরা লাভবান হবে। ফলে এসব প্রক্রিয়াকরণের কারখানা লোকসান ঠেকাতে বড় ভূমিকা পালন করবে।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ফসল আলু। আলু এবং কলার চিপস ও ফ্রায়েড প্রক্রিয়াজাত কারখানা হতে পারে। আম, কলা, আনারসকে ঘিরে বিভিন্ন কারখানা গড়ে উঠতে পারে। সেখানে তৈরি হবে জ্যুস, জ্যাম, জেলি, টিনজাত ফল। ডেইরী ফার্ম ঘীরে হতে পারে আধুনিক কারখানা। দুধ ও মাংসের গুণগত মান ধরে রেখে রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন কর্মপন্থা ধার্য করা যেতে পারে।

প্রতিবন্ধকতা: উত্তরাঞ্চলে ভারী শিল্প গড়ে না উঠার অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাস সরবরাহ না থাকা। কিন্ত বিকল্প জ্বালানি কাজে লাগিয়েও কিছু অকৃষিজ কারখানা স্থাপিত হয়েছে। আরো একটি প্রতিবন্ধকতা হলো দক্ষ জনবল। আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকারের অভাব নেই কিন্ত যোগ্য লোকের অভাব রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট গঠন করার প্রয়োজন আছে। কৃষি গবেষণা ও বিশেষ করে ফুড সেফটি ও ফুড প্রসেসিং এর উপর দক্ষতা সম্পন্ন জনবলের প্রয়োজন আছে।

এখানে জমির মূল্য অন্য বিভাগের তুলনায় কম। এখানকার মানুষও সহযোগিতাপ্রবণ। এ অঞ্চলে শিল্প কারখানা করতে আগ্রহী এমন উদ্যোক্তারা বলেছেন, শিল্পায়নের জন্য এখন প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা। আমি মনে করি, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরও আগ্রহী হওয়ার উচিৎ। কিন্ত তারা কোন প্রকার সুবিধা ছাড়া কেন আসবে? পর্যাপ্ত সুবিধা ছাড়া কোন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবেনা। এখানে তর্কের সুযোগ নেই। তারা বুঝে ব্যবসা।

সরকার সারা দেশে ১০০ টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মান করছে, যার মাঝে কয়েকটা হচ্ছে উত্তরাঞ্চলে। সেজন্য গ্যাস সর্বরাহও শুরু হচ্ছে। সরকারের উচিত সেখানে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানার অনুমোদন দেয়া এবং সেখানকার ইপিযেডে তাদের জমি দেয়া। সেই সাথে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোমার মত সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। শুধু যে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। ইতোমধ্যেই বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ছোট-খাটো গার্মেন্টস কারখানা গড়ে উঠে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারী বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে আলাদা স্মার্ট গার্মেন্টস পল্লী গড়ে তোলা সম্ভব। এখানে সবার দাবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা দান এবং বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য ব্যাংকের সুদ হার কমিয়ে সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা এখন অতি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কোন বিকল্প নেই। ভুলে গেলে চলবেনা, উন্নয়ন একটা চেইন যেটা শিক্ষা, অবকাঠামো, যোগাযোগ এবং প্রযুক্তি দিয়ে গড়া। একটায় টান পরলে অপরটি আগাবেনা।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন ‘পোশাক শিল্পের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, কৃষি গবেষণা ও হাইটেক পার্ক স্থাপনের ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরাও চাই তাই যেন হয়, অতি দ্রুত যেন হয়। ঢাকা জঞ্জালের নগরী। চট্টগ্রাম, গাজীপুরও যেন পথেই হাঁটছে। শিল্পায়ন যেন খাপছাড়া এবং অপরিকল্পিত হয়ে উঠেছে। দেশের পরিবেশ, উন্নয়নের ব্যালেন্স রক্ষা এবং সবচেয়ে উপেক্ষিত ও দারিদ্রপিড়ীত অঞ্চল তথা উত্তরাঞ্চলে মাঝারি ও কৃষি-ভিত্তিক শিল্পের বিকাশের বিকল্প নেই। এতে যেমন কমবে বেকারত্বের হার, বাড়বে জিডিপি, সেই সাথে দেশের অর্থনীতিতে রাখবে বিরাট ভূমিকা।

হিমেল রহমান

Facebook Comments

Related Articles