চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের জন্য হুমকি?

BRI ( Belt and Road Initiative) এর অধিনে চীন বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু শুরু থেকেই এই বিনিয়োগ নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ গুলির মূল কারন হল শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর, পাকিস্তানের গোয়াধর বন্দর, জাম্বিয়ার বিমানবন্দর, জিবুতির অবকাঠামো সহ বিভিন্ন দেশে চীনের বিনিয়োগের পর সেসব দেশ ঋনের কিস্তি শোধ করতে না পারায় অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ চীনকে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক একি রকমের হুমকি অনেকেই দেখছেন। এজন্য সতর্ক হবার পরামর্শ ও দিচ্ছেন।

কিন্তু আজ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে BRI নিয়ে আলোচনা করব।

একপেশে ভাবে চীনের BRI প্রজেক্ট গুলি যে প্রশ্নবিদ্ধ অথবা এটা আর্থিক ভাবে লাভজনক না সেটা নয়। বরং একেক দেশের প্রেক্ষাপটে BRI প্রজেক্ট গুলি একেক রকম অর্থনৈতিক বেনিফিট নিয়ে এসেছে। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের যেসব প্রকল্পে চীন যুক্ত আছে সেগুলার সাথে শ্রীলংকা, পাকিস্তান, জিবুতি বা জাম্বিয়ার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

পাকিস্তান, শ্রীলংকা বা ঋন ফাদে পড়া অন্য দেশ গুলির সব থেকে বড় সমস্যা ছিল যেসব অবকাঠামো করেছিল সেগুলা “field of dreams” মেথডে (build it and they will come) করেছিল। সোজা কথায় “আগে অবকাঠামো করো এরপর কাস্টমার এমনিতেই আসবে” এরকম একটা ধ্যান ধারনা কাজ করেছিল। কেন এই কথা বলছি??

পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার দিকে তাকান। কলোম্বো বন্দরের ফুল ক্যাপাসিটির ৪০% তারা ব্যাবহার করতে পারেনা। বাকি ৬০% এর ক্যাপাসিটি থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যাবহারকারী খুজে পায়নি। পাকিস্তানের করাচী বন্দরের ৫০% ক্যাপাসিটি ব্যাবহার হয়। ক্লায়েন্ট নেই বিধায় তারা অর্ধেক সক্ষমতা ব্যাবহার করতে পারেনা। কিন্তু তারা মোটামুটি একটি স্বপ্নের মত ধরে নিয়েছিল যে হাম্বানটোটা বা গোয়াধর বন্দর করলে কাস্টমারের অভাব হবে না। ভবিষ্যতে কোটি কোটি ডলার আয় হবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নটা সত্য হয়নি। আসেনি কাস্টমার। ব্যাবহারকারী বাড়েনি। বন্দরগুলি কানেক্টিং হাব। হয়ে উঠেনি। কিন্তু তাদের ঋন নিয়ে বিনিয়োগ তো হয়ে গেছে। সুদ সমেত সেটা ফেরত দিতে হবেই। উপায় না পেয়ে চীনের হাতেই তুলে দিতে হয়েছে।

(এখানে কেউ উলটাপালটা ভূগোল বুঝায়েন না যে পাকিস্তান হবে আফ্রিকার গেটওয়ে, গোয়াধর দিয়ে কোটি কোটি টন পণ্য হ্যান্ডেল হবে। এই হবে শব্দটার ফাঁদে পড়েই তারা মারা খেয়েছে। যেদিন হবে সেদিন বইলেন যে হয়েছে। এর আগে বইলেন না)

অন্যদিকে BRI এর গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ভেতর রয়েছে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, এবং বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন। যদিও পদ্মা সেতুতে চীনের ফান্ড নেই কিন্তু BRI এর কানেক্টিং গোলের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিন্তু পাকিস্তানের মত বা শ্রীলংকার মত ভবিষ্যতে ক্লায়েন্ট আসলে চালু হবে এরকম স্বপ্ন ছিলনা। বরং বাস্তবতা ছিল যে বাংলাদেশ বাইরের ক্লায়েন্ট নয় বরং বর্তমান অবকাঠামোতে নিজেদের চাহিদাই মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর তার ফুল ক্যাপাসিটির থেকেও অতিরিক্ত পণ্য হ্যান্ডেল করে যাচ্ছে। মংলা শ্যালো ওয়াটার বন্দর হবার কারনে এখানে চাইলেও বড় জাহাজ ভেড়াতে পারছে না। এরপরো মংলা দিয়ে গাড়ি, টায়ার এবং অন্যান্য কিছু পণ্য আমদানি করে চট্টগ্রামের উপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তাই আমাদের বন্দর বাহিরের ক্লায়েন্টের জন্য বসে নেই। আমাদের ক্রমবর্ধমান $৮৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানি রপ্তানির চাপ স্বাভাবিক রাখার জন্যই প্রয়োজন।

কিন্তু এখানেও বাংলাদেশ বেশ সতর্ক ছিল। চীনকে সোনাদিয়া দেয়নি। সেটার দাবি মিটিয়েছে পায়রা বন্দরে চীনকে অন্তর্ভূক্ত করে। BRI এ পায়রা বন্দর নিয়ে কোন প্রকার আশঙ্কা নেই। এখানে বন্দর ঘিরে আমাদের ক্রমবর্ধুমান গ্যাসের চাহিদা মেটানোর জন্যই এলএনজি টার্মিনাল, পাওয়ার প্লান্ট গড়ে উঠছে। অর্থাৎ এসব প্রকল্প আমরা অন্য দেশ ব্যাবহার করবে এই স্বপ্নের থেকে নিজেদের চাহিদার মেটানোর উদ্দেশ্যেই নিয়েছি কারন আমাদের বর্তমান অবকাঠামো এই চাহিদা পুরোপুরি পূরন করতে পারছে না।

এখানে একটা ব্যাপার হল, বাংলাদেশ ঝুকি বহুমুখী করেছে। যেটাকে আমরা বলি Risk Diversification। অর্থাৎ আমরা শুধু একটি উৎসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হইনি। বরং আমরা সুন্দর মত ব্যালেন্স করেছি।

আমরা বৈদেশিক ঋনের উৎস গুলিকে চীন নির্ভর করিনি শ্রীলংকা, পাকিস্তান বা আফ্রিকান দেশ গুলির মত। ঋন ঝুকি আমরা শেয়ার করেছি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক সহ আরো অনেক উৎসের সাথে।

এখানে জাপানের কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশ জাপানের “BIG-B” Bay of Bengal Industrial Growth Belt Strategy এর অধীনে বিনিয়োগ এবং ঋন নিচ্ছি। যার মাধ্যমে আমরা মাতারবাড়িতে বন্দর, বিদ্যুৎ হাব, এলএনজি টার্মিনাল, ইকোনমিক জোন নির্মাণ করছি।

তাই আমাদের ঝুকি শুধু চীন কেন্দ্রীক নয়। ব্যালান্সিং এর কারনেই আমরা চীনের ঋন ফাদে পড়ব না। সেই সাথে আমাদের বৈদেশিক ঋন $৩১৪ বিলিয়ন ডলারের ইকোনমির বিপরীতে মাত্র $৪০ বিলিয়নের মত। যেটা বিশ্বের বুকে কম ঋণগ্রস্ত দেশের মধ্যে আমাদেরকে স্থান করিয়ে দিয়েছে।

অনেক বড় লেখা হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা আরো বিশদভাবে ব্যাখ্যার দরকার ছিল। কিন্তু সেটা আপাতত সম্ভব না।

শেষকথা হল, বাংলাদেশ হল একটা বাঘ যেটাকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে। এই শিকল গুলি হল দূর্নীতি, দূর্বল অবকাঠামো। যেহেতু দূর্নীতি বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই আজ পর্যন্ত বর্তমান আছে তাই এটা একটা কমন ফ্যাক্টর। কিন্তু অবকাঠামো দ্যুর্বলতার কারনে বাঘ শিকল ছিড়ে হুংকার দিয়ে লাফ দিতে পারছে না। আটকে যাচ্ছে আমাদের আমদানি রপ্তানি অপর্যাপ্ত বন্দর সুবিধার কারনে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার জন্য দেশের অনেক অঞ্চল এখনো বিচ্ছিন্ন। তবে BRI প্রজেক্টগুলি হলে শেকল ছিড়বে। গর্জন শুনবে সারা বিশ্ব।

ছোট করে আরেকটি বিষয় বলতে চাই। ভারতের জন্য BCIM চীনের BRI প্রজেক্ট থেকে বাদ পড়েছে। যদি এটি বাস্তবায়িত হত তাহলে দুটি বৃহৎ অর্থনীতি ভারত এবং চীনের মাঝে কানেক্টিং হাব হয়ে বাংলাদেশ সব থেকে বেশি সুবিধাভোগী হতে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। কিন্তু আমাদের উত্থান কেউ থামাতে পারবে না ইনশাল্লাহ।

© Defres360.com (wasimahin)

Facebook Comments

Related Articles