অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনের আগের কিছু ঘটনা

একসময় পুরো পৃথিবী শাসন করেছিল অটোম্যান সুলতানরা। বিভিন্ন শাসকদের স্বর্ণযুগ পেরিয়ে একসময় তা শেষের মুখ দেখে। এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের শেষ পরিণতি ছিল খুব ভয়াবহ।এই সাম্রাজ্যের সর্বশেষ শাসকের পতন হয়েছিল গত শতাব্দীর শেষের দিকে। সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন রাজ্যের দখল নিয়েছে ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশ। ফ্রান্স দখল করে নিয়েছে তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া। ব্রিটিশরা সুদান আর মিশরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এমনকি আরবরাও অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্হ থাকতে অস্বীকার জানায়। এর মধ্য থেকে বাদ যায় নি রাশিয়াও।

অন্যদিকে, বলকান অঞ্চলে ক্রমেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল অটোম্যানরা। এর মূলে ছিল বুলগেরিয়া, সার্বিয়া আর গ্রিসের প্রবল চাপ। ইউরোপ থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় নি অটোম্যানরা। তারাও তাদের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। তরুণ তুর্কিরা গঠন করে একটি সংগঠন। নাম দেয় ‘কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেস’। বিদেশে নির্বাসিত কিছু তরুণ তুর্কিদের নিয়ে গঠিত এই দলটি পরবর্তীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই তরুণ তুর্কি দলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনজন নেতা যারা “তিন পাশা” হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রথম মহাযুদ্ধে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই তিন পাশা।

অত্যাচারী সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ চেয়েছিলেন অটোম্যান সাম্রাজ্যকে পুনরায় তার স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে আনতে। ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক তুর্কি আধুনিক তুরস্ক চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল সুলতান হামিদকে সরিয়ে আধুনিক চেতনায় বিশ্বাসী এমন কোনো সম্রাটকে। এমনকি এক্ষেত্রে তারা সেনাবাহিনীর সমর্থনও পেয়েছিল। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯০৮ সালে বিপ্লব গড়ে তুলে তারা। প্রবল বিপ্লবের মুখে সুলতান আব্দুল হামিদ তাদের কিছু শর্ত মেনে নেন। গঠণ করা হয় পার্লামেন্ট। যেখানে দ্বিতীয় সুলতান হামিদ নামমাত্র প্রধান থাকলেও আধিপত্য বিস্তার করে তরুণ তুর্কিরা।

তবে তরুণ তুর্কিদের বিপক্ষে কেউ ছিল না এমনও নয়। তুরস্কের গোড়া মোল্লারা যারা আধুনিকতায় বিশ্বাসী ছিল না তারা তাদের আনুগত্য দ্বিতীয় সুলতান হামিদের ক্ষেত্রে বজায় রেখেছিলেন। এছাড়াও সুলতান আব্দুল হামিদ ছিলেন খলিফা। নামেমাত্র হলেও বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের মধ্যে খলিফার প্রতি বাড়তি একটা আনুগত্য কাজ করতো।

খলিফা আব্দুল হামিদ নিজেও বেশ বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি জার্মানির সাথে বেশ সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। মূলত ব্রিটেন, ফ্রান্স, আরব আর রুশদেরকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে তিনি একাজ করেছিলেন। অটোমান সাম্রাজ্যকে পুনরায় সমৃদ্ধ করে তুলতে তিনি সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন জার্মানির উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাইজার দ্বিতীয় উইলহেলমের সাথে। বিপুল অর্থব্যয়ে বানানো হয় বার্লিন-বাগদাদ রেলপথ।

তরুণ তুর্কিদের মধ্যে একটা অংশ পরে ‘ফ্রিডম অ্যান্ড অ্যাকর্ড’ পার্টি গঠন করে। দুই অংশের মধ্যে কোন্দলের জের ধরে মারামারি লেগেই থাকতো। ১৯১৩ সালে ফ্রিডম অ্যান্ড অ্যাকর্ড পার্টিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে অটোম্যান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এই আলোচ্য তিন পাশা। এদের নেতৃত্বেই পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্য প্রথম মহাযুদ্ধে প্রবেশ করে। তবে এই তিন পাশাকেই আর্মেনীয় গণহত্যার জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে। অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই পাশাদের নেতা ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধান মন্ত্রী তালাত পাশা। এনভার পাশা ছিলেন যুদ্ধমন্ত্রী আর জামাল পাশা ছিলেন নৌমন্ত্রী। ১৯১৮ সাল পর্যন্ত একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ছিলেন তারা।

তিন পাশার বিরুদ্ধে সবথেকে বড় অভিযোগ ছিল গণহত্যার। অটোম্যানদের চিরশত্রু লক্ষ লক্ষ আর্মেনীয়, গ্রিক আর আসিরীয়কে হত্যার দায় উঠে তাদের উপর। তবে রাশিয়া আর গ্রিস তাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় একের পর এক হারের মুখে পড়ে পাশারা হারের জন্য এই সংখ্যালঘু জাতিকে দায়ী করেন এবং গণহারে হত্যা করেন।

তালাত পাশাঃ
১৮৭৪ সালে মেহমেত তালাত জন্মগ্রহণ করেন। তার শুরুর জীবনটা সাদামাটা হলেও তরুণ তুর্কি আন্দোলনে জড়িত থাকবার সুবাদে তার দ্রুত পদোন্নতি ঘটতে থাকে। কিছুকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

১৯১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েও রুশ আর ব্রিটিশদের অগ্রগতি রুখতে তিনি ব্যর্থ হন এবং ১৯১৮ সালে নিজ দায়িত্বে ইস্তফা দেন। জার্মান সাবমেরিনে চড়ে পালিয়ে যান তিনি এবং এর সপ্তাহখানেকের মধ্যে ইস্তাম্বুলের পতন ঘটে। সুলতান হামিদ তার পুরনো শত্রুকে খুঁজে বের করবার জন্য প্রবল চেষ্টা চালান এবং গণহত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তার অনুপস্থিতেই।

তালাত জার্মানিতে গিয়ে সেখান থেকেই তুরস্কে আবার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তুলার কথা ভাবছিলেন । তবে তার আগেই, ১৯২১ সালে সঘোমন তেহলিরিয়ান নামের এক আর্মেনীয় ঘাতকের একটি গুলিতে তালাত পাশা নিহত হন।

জামাল পাশাঃ
দক্ষ শাসক হিসেবে পরিচিত জামাল পাশা রুশদের বিরুদ্ধে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জার্মানির পক্ষ নেওয়ায় ব্রিটিশ আর রুশ উভয়ের রোষানলে পড়ে অটোম্যানরা। ইরাকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হেরে পালান তিনি। পরবর্তীতে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ পেলেও সুয়েজ খাল দখলের দুটো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে অত্যন্ত নিষ্ঠুর হিসেবে পরিচিত জামাল পাশা ক্ষয়িষ্ণু অটোমান সেনাদল নিয়েই তিনি উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়েছিলেন।

১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের জর্জিয়ার তিফলিস শহরে আর্মেনীয় গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন তিনি।

এনভার পাশাঃ
মাত্র ২৫ বছর বয়সেই মেজর জেনারেল হয়ে বসা এনভার ১৯১৩ সালে পাল্টা এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করেন। ঐ বছরই বুলগারদের হাত থেকে আদ্রিয়ানোপল দখল করে নিয়ে এনভার রীতিমতো মহানায়ক হয়ে ওঠেন। প্রথম মহাযুদ্ধে অটোমানদের অংশগ্রহণের ব্যাপারে এনভারই সবথেকে আগ্রহী ছিলেন।

দক্ষ শাসক পরবর্তীতে বাসমাচিদের দলে যোগ দিলেও তার আসল উদ্দেশ্য ছিল তুর্কিদের জন্য শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তবে এনভারের বেপরোয়া স্বভাবের কারণে বুখারার আমিরের সাথে তার সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ১৯২২ সালে লাল ফৌজের হামলায় মৃত্যু বরণ করেন তিনি এবং ১৯৯৬ সালে ইস্তাম্বুলে তার মৃতদেহ ফেরত আনা হয়।

—Roarbangla

Facebook Comments

Related Articles