দেশে নিরবে নিভৃতে গড়ে উঠা খেলনা শিল্পের কথা

খেলনা নিয়ে খেলতে কে না ভালোবাসে? শিশুদের বিকাশে খেলনার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এসব খেলনার গায়ে কখনো লেখা থাকে মেড ইন চায়না, কখনো জাপান। ভীনদেশী খেলনা আমাদের শিশুদের খেলার সাথী হলেও তখন সেই জায়গা দখল করেছে দেশিয় খেলনা গুলো।
আমাদের দেশে কয়েক বছর আগেও উচ্চ ও স্বল্পমূল্যের প্লাস্টিকের খেলনার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। গত পাঁচ বছরে এই জায়গায় আমুল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে এসব খেলনার একটা বড় অংশই তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। রফতানি হচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান সহ বিশ্বের নানা দেশে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান ইপিযেডে রফতানির কথায় মাথায় রেখে খেলনা উৎপাদন করে যাচ্ছে। আবার ক্ষুদ্র আকারেও এই শিল্পটি গড়ে উঠেছে পুরনো ঢাকা এবং আশপাশের কিছু এলাকাকে কেন্দ্র করে। কিছু কিছু খেলনার কারখনা গড়ে উঠে ছড়িয়ে গেছে সারা দেশে। বাংলাদেশ টয় মার্চেন্টস, ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড ইম্পোটার্স এসোসিয়েশন থেকে জানা যায়, আগে অনেক নিম্নমানের দেশি পণ্যই শুধু বাংলাদেশে তৈরি হতো। এছাড়া বেশিরভাগ খেলনা চায়না থেকে আনা হতো। বর্তমানে অনেক চায়না পণ্য আমাদের দেশেই তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

দেশে ও দেশের বাইরে এখন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাস্টিকের খেলনার চাহিদা। বাচ্চাদের খেলার জন্য প্লাস্টিক দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলনাসামগ্রী যেমন, বল, পুতুল, গাড়ি, প্লেন, পিস্তল, সুপারম্যান, এক্স-বক্স, রঙিন বর্ণমালা, কাপড়ের তৈরি ছোট ছোট খেলনা কিংবা বিভিন্ন পশুপাখি, কিচেন সেট, বার্বি সেট, ডলস হাউস এবং মেকিং টয়সহ আরো নানা খেলনা। জানা যায়, বাংলাদেশে কয়েক দশক আগে অযান্ত্রিকভাবে কিছু খেলনা উৎপাদন হতো এবং দেশজুড়ে সেসব খেলনারই চাহিদা বেশি ছিল। কিন্তু ৯০এর দশকের শুরুতে খেলনা আমদানি শুরু হয় এবং একসময় এটি প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে। যে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে গত কয়েক বছরে। বর্তমানে আমাদের দেশেই এসব খেলনার বড় একটা অংশ তৈরি করছে। শুধু যে বাচ্চাদের খেলনা তা নয়। অনেক বড় মানুষের খেলনাও বানানো হচ্ছে দেশে। বিদ্যুৎ ও ব্যাটারিচালিত খেলনা এখন ছোটাছুটি করে সবাইকে আনন্দ দিয়ে চলছে। হাতি, ঘোড়া, বাঘ-ভল্লুক, বাস ও ট্রেন সব রকমের ‘জ্যান্ত’ খেলনাই বিজ্ঞানের কল্যাণে হাতের নাগালে। পুতুল, ইয়ো-ইয়ো, লাটিম, বল, বাঁশি, ঘুড়িসহ আরো কত রকমের খেলনারই না দেখে মেলে দোকানে। এর অর্ধেক তৈরি হচ্ছে দেশে। সেই সাথে যাচ্ছে বিদেশেও। যেখানে ঠিক দশ বছর কি পাঁচ বছর আগেও পুরো খাতটি ছিলো চীন নির্ভর।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি সংক্রান্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, দেশে খেলনার চাহিদা বাড়ায় বেড়েছে এ শিল্পে ব্যবহৃত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ। এছাড়া বড় এবং মাঝারি আকারের খেলনা কারখানার মালিকেরা এখন খেলনা বিদেশে রপ্তানি বাড়ানোর পথ খুঁজছেন। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশি খেলনা রপ্তানি বেড়েছে দুই হাজার গুণের বেশি। ছয় বছর আগে যেখানে বছরে মাত্র সাত হাজার ডলারের মতো খেলনা রপ্তানি হতো, এখন তা বেড়ে দেড় কোটি ডলারে পৌঁছেছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ১২৬ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি খেলনার চাহিদা সামনে রেখে অবশ্য খেলনা কারখানা নির্মাণে বিনিয়োগেও আগ্রহী হয়ে উঠছেন উদ্যোক্তারা। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) এবং এর বাইরে বেশ কয়েকটি রপ্তানিমুখী খেলনার কারখানা গড়ে উঠেছে। সারা দেশের বিভিন্ন ইপিজেডে দুটি খেলনা কারখানা আছে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানির চিত্রটি বেশ আশাবাদী হওয়ার মতো। পাঁচ বছরের ব্যবধানে শিশুদের খেলনা রপ্তানি ২ হাজার ৭৫ গুণ বেড়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৭ হাজার ৬৩৭ ডলারের খেলনা রপ্তানি হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খেলনাসামগ্রী রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোনো পণ্য রপ্তানির এত বিকাশের নজির খুব বেশি নেই। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে খেলনা রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭০ লাখ ৩৫ হাজার ডলার। সেই হিসাবে, শুধু গত এক বছরের ব্যবধানে শিশুদের খেলনা রপ্তানি দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৩০ লাখ ৮০ হাজার ডলারের শিশু খেলনা। এর আগের বছর এই খাতে পরিমাণ ২২ লাখ ২০ হাজার ডলার।

বাংলাদেশ থেকে খেলনা রপ্তানির তালিকায় আছে ট্রাইসাইকেল, ইলেকট্রিক বা ব্যাটারিচালিত খেলনা গাড়ি, প্যাডেলচালিত গাড়ি, ইলেকট্রিক পুতুল, সাধারণ পুতুল ইত্যাদি। বাংলাদেশ থেকে যত খেলনা রপ্তানি হয়, এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি ট্রাইসাইকেল, স্কুটার, প্যাডেল কার, পুতুল ইত্যাদি। অবশ্য এসব খেলনার দামও তুলনামূলক বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কোন কোন দেশে কত রপ্তানি হয়েছে, এর চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যায়নি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৪টি দেশে শিশু খেলনা রপ্তানি হয়েছে। ওই বছর মোট ৭০ লাখ ডলারের শিশু খেলনা রপ্তানি হলেও এর অর্ধেকই হয়েছে তিনটি দেশে। বাংলাদেশি খেলনা আমদানিতে শীর্ষ স্থানে আছে ফ্রান্স। দেশটি ওই বছর বাংলাদেশ থেকে ১৬ লাখ ডলারের খেলনা আমদানি করেছে। এরপরের স্থানে থাকা স্পেন নিয়েছে ১১ লাখ ৬৩ হাজার ডলারের খেলনা। আর জাপানে রপ্তানি হয়েছে ৯ লাখ ২৯ হাজার ডলারের খেলনা। বাংলাদেশ থেকে খেলনা আমদানির তালিকায় যেসব দেশ আছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাজ্য, ইতালি, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল।

খেলনা রপ্তানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে কর সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন ট্রাইসাইকেল, স্কুটার, প্যাডেল কার, পুতুল রপ্তানি করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে আমদানি শুল্ক নেই। প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক খেলনার ওপর ৪ দশমিক ৭ শতাংশ আমদানি শুল্ক আছে। আর জাপানের বাজারে শুল্ক নেই। খেলনা তৈরি একটি শ্রমঘন শিল্প। পোশাকের মতো এই শিল্পেও প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। আর খেলনার বিশ্ব বাজারের আকারও বিশাল। বাংলাদেশ খুব ছোট পরিসরে এ বাজারে প্রবেশ করেছে। মূলত, মজুরি বেড়ে যাওয়ায় চীনে খেলনা তৈরির খরচও এখন বেড়ে গেছে। এ কারণে বিদেশি খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মতো দেশে কারখানা গড়তে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

আর এই খেলনা শিল্পকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা ও অনুদান থেকে সহায়তা তহবিল প্রদানের দাবিও জানিয়েছে বাংলাদেশ টয় মার্চেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড ইমপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিটিএমএমআইএ )

ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম।

Facebook Comments

Related Articles