ভারতের নতুন শিক্ষানীতি থেকে আমাদের শিক্ষা

“If your plan is for one year, plant rice.
If your plan is for ten years, plant trees.
If your plan is for hundred years, educate children. “
-Confucius

কনফুসিয়াসের এই কথাগুলোই যে বর্তমানের উন্নত দেশগুলোর সফলতার সিঁড়ি, তা হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করেন। এমনকি বর্তমান চীনের উন্নতির কারনও এই শিক্ষা। হয়ত সেই সুর ধরে ভারতে ৩৪ বছরপর নতুন শিক্ষানীতি গৃহীত হয়েছে, পরিবর্তন এসেছে মৌলিক গঠনে। যেই গঠন থেকে শেখার অনেক কিছু আছে আমাদের।

ভারতের নতুন শিক্ষানীতির কিছু সমালোচনা থাকলেও এটা যে সময়োপযোগী পদক্ষেপ তা কেউ অস্বীকার করবে বলে আমার মনে হয় না। সবার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নেওয়া যাক এই শিক্ষানীতি সম্পর্কেঃ

১) পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষার ওপর জোর।
২) স্কুলের পাঠ্যসূচি সংক্ষিপ্ত করে মূল ধারনায় নামিয়ে আনা।
৩) ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে কারিগরি শিক্ষা ।
৪) মার্কশিটে শুধুমাত্র নম্বর এবং পরিসংখ্যানের পরিবর্তে প্রাধান্য পাবে দক্ষতা এবং যোগ্যতা।
৫) জ্ঞানের প্রয়োগিক দিকের উপরে ভিত্তি করে বোর্ডের পরীক্ষা নেওয়া হবে।
৬) M.Phil কোর্স উঠে যেতে চলেছে।
৭) ল’ এবং মেডিক্যাল ছাড়া বাকি সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাতার তলায় আসতে চলেছে।
৮) সরকারি এবং বেসরকারি নির্বিশেষে সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন রেগুলেশন চালু হবে।
৯) যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা ক্ষেত্রে জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করবে সরকার।

এই নীতির কিছু চমকপ্রদ দিক রয়েছে যা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি৷
প্রথমত, ক্লাস ৬ থেকে কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা হবে , এতে করে শিক্ষাথী বই এর শিক্ষার পাশাপাশি হাতে কলমে শিক্ষা অর‍্যন করবে, ফলে শুধুমাত্র চাকরির আশায় বসে না থেকে সবাই নিজে থেকে কিছু শুরু করতে পারবে। কারিগরি শিক্ষার মধ্যে এমন বিষয় শেখানো হবে যাতে করে শিক্ষাথীরা স্বাবলম্বী হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ক্লাস ১-৮ পর্যন্ত প্রতি বছর শেষে পরীক্ষা না নিয়ে শুধুমাত্র ক্লাস ৩, ৫,৮ এ পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর ফলে কোমলমতি শিশুদের পরীক্ষার ভয় কিছুটা হলেও দূর হবে। এমনকি অভিভাবকদের মধ্যে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়, যা অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা যায়।

আরেকটা চমৎকপ্রদ দিক হচ্ছে ক্লাস ৯ থেকে কোন বিভাগ থাকবে না শুধুমাত্র কিছু ডিপার্টমেন্ট ছাড়া । অর্থাৎ আপনি একইসাথে রসায়ন ও রাজনীতি নিয়ে পড়তে পারবেন । যাকে বলা হয় “Diversify of knowledge “. যা পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশে লক্ষ্য করা যায়।

আমাদের দেশে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে স্নাতক ৪ বছর শেষ করার ফলে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, কেউ যদি ১ বছর বা ২ বছর স্নাতক অসম্পূর্ণ রাখে তাহলে সে বঞ্চিত হয়, যা ভারতেও কার্যকর ছিল কিন্তু বর্তমানের নীতি অনুযায়ী, কেউ ১ বছর সম্পন্ন করে চলে গেলে, সে ১ বছরের জন্য স্নাতক ১ বছর সম্পন্ন করার সাটিফিকেট পাবে, ২ বছর সম্পন্ন করলে ডিপ্লোমার সমমানের সার্টিফিকেট পাবে।
এর পাশাপাশি এইবারই প্রথম pre-primary education কে গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে , যেটা গ্রমীণ পর্যায়ে দেখা যেতো না।
কংগ্রেস বা বিজেপি, ক্ষমতায় আসার পূর্বে সবাই শিক্ষা খাতর জন্য ৬% বরাদ্দ রাখার কথা বললেও তা ৪.৫% পার হয়নি কোনদিন কিন্তু নতুন নীতি অনুযায়ী তা সরকার করবে বলে আশা করা যায়।

অনেকের মতে এটা আসলেই একটা ভালো উদ্যোগ । এবং এই শিক্ষানীতি ভারতের নতুন মাস্টারস্ট্রোক হতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে অনেক সময় আলোচনা হয়। শিক্ষার মানের প্রশ্নে সবসময় আটকে যায় আমাদের নীতিনির্ধারকেরা। এখনই সময় আলোচনার, এখনই সময় পরিবর্তনের। ফ্লোরেন্সে শুরু হওয়া রেনেসাঁসের হাওয়া যেমনভাবে পুরো ইউরোপ ছড়িয়েছিল, ভারতের নতুন শিক্ষানীতির পরিবর্তনের হাওয়া তেমনভাবে সারিয়ে তুলবে আমাদের এই ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে , যেখানে জ্ঞানঅর্জনের চেয়ে সরকারি চাকরিপাওয়া মূখ্য, যেখানে চলে নীতিবহির্ভূতভাবে টাকা কামানোর যুদ্ধ।

মোঃ আশিকুল হাবিব
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments

Related Articles