তুতেনখামেন

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ১৩৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আমারনায় জন্মগ্রহণ করেন তুতেনখামেন। তার পিতা ছিলেন আখেনাতেন। ২০১০ সালে এক ডি এন এ পরীক্ষায় উক্ত তথ্য জানা যায়। আখেনাতেন সেসময় আমারনার শাসক ছিলেন। তিনি এমন প্রতাপশালী শাসক ছিলেন যে কাল্ট পরিবর্তন করে তিনি আতেনের উপাসনার ব্যাবস্থা করেন। তিনি শুধু রাজপরিবারের জন্য আতেনের উপাসনার ব্যাবস্থা রেখেছিলেন।

সাধারণ মানুষ সরাসরি আতেনের উপাসনা করতে পারত না। প্রথমে তাদেরকে আখেনাতেনের উপাসনা করতে হত। প্রবল প্রতাপশালী হলেও বাহিরে বেশি বের হতেন না রাজা আখেনাতেন যা পরবর্তীতে রাজ্যের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছিল। রাজার ঘরকুনো হওয়ার সুযোগ নিয়ে বাহিরের বিভিন্ন পক্ষ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল যা পুরো মিশরে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। এর মধ্যে জন্ম নেন তুতেনখামেন, মিশরের ভবিষ্যৎ রাজা।

দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে বাড়িয়ে দিতে আক্রমণ শুরু হয় প্লেগের। মহামারী প্লেগে অনেক সাধারণের সাথে মৃত্যুবরণ করে রাজপরিবারের বেশিরভাগ সদস্য। মাত্র ৮ বছর বয়সী তুতেনখামেনকে রাজা ঘোষণা করা হয়। তুতেনখামেন মিশর শাসন করেছিল মাত্র ১০ বছর। তার শাসনামলের বেশ কিছু পদক্ষেপ লক্ষ্যণীয় ছিল। বেশ দুরন্ত ছিল তুতেনখামেন। শিকার আর রথ প্রতিযোগিতার শখ ছিল তার। তার বাবা আখেনাতেন বেশ ঘরকুনো হলেও তুতেনখামেন বেশিরভাগ সময় বাহিরে থাকতেন। তার মৃতদেহের সাথে পাওয়া কিছু নিদর্শন অন্তত এমন কিছুরই ইঙ্গিত দেয়। তার কাদা মাখানো জুতা,সমাধিতে পাওয়া আগুন জ্বালানোর অস্ত্র তার প্রাসাদের বাহিরে অনেকটা সময় কাটানোরই প্রমাণ। পাচ বছর বয়স থেকেই অস্ত্র চালনার বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করেন তিনি।

ছোট থেকেই যুদ্ধের বিভিন্ন নীতি সম্পর্কে জানতেন তুতেনখামেন। তার সমাধি থেকে পাওয়া যায় তীর,ধনুক,বর্শা,ছোট তলোয়ার, এমনকি ঘোড়া ও রথ চালনায় যে দস্তানা ব্যাবহার করতেন সেটাও। তুতেনখামেনের সমাধি হতে পাওয়া মুখোশের পিছনে রয়েছে এক কাহিনি। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিশ্বের সামনে তুতেনখামেনকে তুলে ধরতে তার মুখোশ সংগ্রহ করেছিলেন,এবং এর জন্য তাদের তুতেনখামেনের মাথা কাটতে হয়েছিল। এছাড়াও বিভিন্ন ছবি পাওয়া যায় যেখানে দেখা যায় দুরন্ত তুতেনখামেন সাধারণ মানুষের সাথে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছেন। তুতেনখামেনের সমাধিতে পাওয়া যায় চারটি জীর্ণ রথ। তার বাবা আখেনাতেন সেসময় রথ ব্যাবহার করতেন নিজেদেরকে উচ্চস্থানীয় হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে। পরবর্তীতে তুতেনখামেন রথ চালিয়ে শিকারে যেতেন। দুর্ধর্ষ ষাড় এবং সিংহ শিকারের কাহিনি চিত্রিত আছে।

এছাড়াও চিত্রকল্পগুলোতে তার শিকার দিয়েই ভোজ আয়োজন করতে দেখা গিয়েছে রাজপ্রাসাদে। রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তুতেনখামেনের অসামান্য অবদান দেখা যায়। তার বাবা আখেনাতেনের আমলে যেসকল কূটনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল তা সমাধান করতে চেয়েছিলেন তুতেনখামেন। তিনি তার পূর্বপুরুষ ফারাওদের নীতি ফিরিয়ে আনেন। বিভিন্ন নীতি সংস্কার করেন। থিবসকে রাজধানী ঘোষণা করেন যা পরবর্তীতে অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তিনি আমুনকে মিশরের দেবতা ঘোষণা করেন এবং কারনাকের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

১০ বছর মিশর শাসন করার পর মাত্র ১৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন রাজা তুতেনখামেন। তবে তার মৃত্যু নিয়ে রয়েছে অনেক রহস্য। যুদ্ধক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল সেসম্পর্কে নিশ্চিত নন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। তবে তুতেনখামেন যে এখনো রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তা মনে হয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তথ্যসূত্রঃ roarmedia

Facebook Comments

Related Articles