বিআরআই; বাংলাদেশের জন্য সুযোগ না ফাঁদ?

সন্দেহ নেই যে চীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ। এবং চীন যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হওয়ার স্বপ্ন দেখে যা সবার অজানা নয়। চীনের উত্থানকে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এবং বেল্ট অ্যান্ড রোডের উদ্যোগ চীনকে তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় সহায়ক । ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং তাঁর এই উদ্যোগের কথা প্রকাশ করেছিলেন কাজাখস্তান ও পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়ায় । বিআরআই প্রকল্পকে (BRI – Belt and Road Initiative) মানবজাতির ইতিহাসের বৃহত্তম অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসাবে বিবেচিত করা হয় , এটি ২০১৭ সালের হিসাবে ৬৮ টিরও বেশি দেশ, বিশ্বের জনসংখ্যার ৬০% এবং জিডিপির ৪০% আচ্ছাদন করে । এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নাম হ’ল “সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট এবং একবিংশ শতাব্দীর মেরিটাইম সিল্ক রোড”। ইংরেজি অনুবাদ ২০১৬ সাল থেকে ” ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ” থেকে পরিবর্তন করা হয়েছে। বিআরআইয়ের মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্য বৃদ্ধি করা, অর্থনৈতিক বিকাশ এবং আন্তঃ আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রচার করা। BRI প্রকল্পের আওতায় হাইওয়ে, বন্দর, ওভারল্যান্ড রেল রুট, গ্যাস পাইপলাইন এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হবে । চীন থেকে জার্মানি, স্পেন, ইরানে ইতিমধ্যে চলমান ট্রেনগুলি এরই উদাহরণ মাত্র ।

এখন চীন, দক্ষিণ এশিয়াকে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া প্যাসিফিকের স্বপ্নের অঞ্চল হিসাবে পরিচিত এবং পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী অঞ্চল হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে বিবেচনা করা হয় .চিন দীর্ঘসময় ধরে এই অঞ্চলে তার অস্তিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। আর বিআরআই হ’ল এই অঞ্চলের সাথে তার সম্পর্ক বাড়ানোর মাধ্যম। সিপিইসি (CPEC-China Pakistan Economic Corridor) এর নিখুঁত উদাহরণ এটি পাকিস্তানের সাথে তার সম্পর্ককে দৃঢ় করতে সহায়তা করে। কোন সন্দেহ নেই যে, চীন এখন বাংলাদেশকে নিজের কাছে ভিড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছে ।

বাংলাদেশ দ্রুততম ক্রমবর্ধমান একটা অর্থনীতি প্রায় ১৬ কোটি মানুষের বসবাস ১,৪৭,৬১০ বর্গ কিমি আয়তনে । ২০১৯ সালে জিডিপি বৃদ্ধি প্রায় ৫.২৪%, যা এই কোভিড পরিস্থিতিতে অসাধারণ একটা অর্জন । বাংলাদেশ এখন ভারত পর দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি । এই স্পষ্ট কারণেই চীন বাংলাদেশকে এত গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে । চীন ও বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। চীনা সরকারের মতে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক “সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারিত্ব”। তবে এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য খুব অল্পই ছিল কিন্তু ২০১৬ সালের পর বাংলাদেশ যখন বিআরআই-তে যুক্ত হয়েছে, বানিজ্যের দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছ। গত ২০ বছরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি ১৬০০% বৃদ্ধি পেয়েছে, আমদানিকৃত ২৫% পরিমাণ বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করে যা প্রায় ১৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এর বিপরীতে রফতানি হয় মাত্র ০.৫৬ বিলিয়ন মার্কিনডলার। তবে বাংলাদেশ এইটা ভেবে খুশি হবে যে, সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের ৯৭% পণ্যের শুল্ক মওকুফ করেছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চীনের গুরুত্ব যতই বাড়ছে, ততই আরও প্রশ্ন উঠছে। অনেক কূটনীতিক মনে করেন যে চীনের পরিকল্পনা ‘ঋণের ফাঁদ কূটনীতি'( Debt Trap Diplomacy) হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের পরে বাংলাদেশ চীনের পরবর্তী শিকার হবে। অনেক চিন্তাবিদরা এও বলেন , বাংলাদেশকে ব্যবহার করে চীন কেবল ভারতকে চাপ দেওয়ার দিকে মনোনিবেশ করছে, এবং চীন এখন পর্যন্ত যত উন্নয়ন করেছে তা বঙ্গোপসাগর অঞ্চলটি কেবল তাদের স্বার্থে ব্যাবহার করার জন্যই । বাংলাদেশ কি তাহলে চীনের পরবর্তী ভিকটিম হবে?…. (চলবে)

মোঃ আশিকুল হাবিব
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments

Related Articles