বাংলাদেশী পর্যটক নেই; পথে বসছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা

ভারতে সোমবার প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশটির অর্থনীতি নজিরবিহীনভাবে ২৩.৯% সংকুচিত হয়েছে, যেটা গত চল্লিশ বছরে দেখা যায়নি। বৃহৎ অর্থনীতির দেশটি বৈদেশিক মুদ্রা সহ জিডিপিতে অবদান আছে বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিকদের। বাংলাদেশের ভুমিকাও দেশটিতে কম নয়। প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ বাংলাদেশী ভারতে ভ্রমণ করেন। চিকিৎসা, ভ্রমণ সহ কেনাকাটার জন্য ভারতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশীর অভ্যেস। এছাড়াও বাংলাদেশে কর্মরত বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের রেমিট্যান্স দেশটির অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।

এ বছরের ৭ ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়সে ভেলের ‘বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ভারতীয়দের দাপট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয় বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় বিভিন্ন খাতে চাকরি করছেন। এদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশের ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে। বেশিরভাগ অর্থাৎ সাড়ে ৪ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছেন ট্যুরিস্ট ভিসার নামে।

তবে বাংলাদেশে কর্মরত প্রবাসী ভারতীয়র চেয়ে ভারতে ভ্রমণরত বাংলাদেশীরা ভারতের অর্থনীতির বড় একটা শক্তি। করোনার কারনে বাংলাদেশিরা ভারতে না যাওয়ায়, চরম অর্থ সংকটে পড়েছেন, দেশটির বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা।

যে উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশীরা ভারতে যাক না কেন, ভারতের বাস থেকে শুরু করে এয়ারবাস কিংবা সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রেতা থেকে শুরু করে চাল বিক্রেতা সবাই এর সুবিধাভোগী। বাংলাদেশীদের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। একটানা ছয়মাস বাংলাদেশীদের না পেতে পথে বসার উপক্রম তাদের।

ভারতের ব্যুরো অফ ইমিগ্রেশন দপ্তরের হিসেব মতে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পর্যটক যায় বাংলাদেশ থেকেই। জানিয়েছে বিবিসি।

দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালের রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে এক কোটির বেশি বিদেশী পর্যটকদের থেকে বিদেশী মুদ্রা বিনিময় থেকে দেশটি আয় করেছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৭৪ কোটি রুপি।

২০১৭ সালে যেসব দেশ থেকে বেশি সংখ্যায় পর্যটক ভারতে গেছে তার শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। রিপোর্ট অনুযায়ী ২১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৭ জন বাংলাদেশী পর্যটক ভিসায় ভারতে গেছে। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের সংখ্যা ছিলো ১৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯১৯ জন।

কাশ্মীর, লাদাখ কিংবা সিকিমের মতো আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর অধিকাংশ পরদেশী পর্যটক বাংলাদেশী। বরফ, পাহাড়, তুষারপাত কিংবা মরুভূমি দেখতে বাড়ির কাছের ভারতই ভরসা অধিকাংশ বাংলাদেশী পর্যটকের। ইউরোপের একজন লোকের বরফ বা তুষার দেখার জন্য এতদূর আসার দরকার হয়না। তাই এসব এলাকার পর্যটন শিল্পের প্রাণ বাংলাদেশের লোকজন। এসব এলাকায় গড়ে ওঠা হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা গাড়ির ব্যবসা এখন একদমই বন্ধ।

বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, মুম্বাই ও কোলকাতায় বাংলাদেশী রোগীদের যাতায়াত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। বেঙ্গালুরুর হশুর শহরে প্রখ্যাত চিকিৎসক দেবী শেঠির হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান নারায়ণা হাসপাতালের শতকরা ৯০ ভাগ রোগী বাংলাদেশী৷ এত বিপুল সংখ্যক বাঙালী রোগী থাকায় এখানে কর্মরত চিকিৎসক বা নার্সরাও বাংলা ভাষায় কথা বলা শিখে গেছেন। বাংলাদেশী না থাকায় হাসপাতালটি জুড়ে যেন নির্জনতা নেমে এসেছে। মজুমদার শ্য’ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের চিকিৎসক নটরাজ কেএস এর রোগীর সংখ্যা শতকরা ৮০ ভাগ কমে গেছে। শহরটির হেন্নাগারা রোডের পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রেস্টুরেন্ট, গেস্ট হাউজ, ট্যুর অপারেটর, টিকেট বিক্রি বা মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান।

এমনই এক ব্যবসায়ী মিঃ বিজয়। তিনি কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোরে চলে এসেছেন, তার বাংলায় কথা বলার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক বছর ধরেই ট্যুর অপারেটর বিজনেস করছেন হেন্নাগারা রোডে। তিনি জানান কেবল নারায়না হাসপাতালেই লক্ষাধিক বাংলাদেশী রোগী আসেন। বাংলাদেশী রোগী ও রোগীর স্বজনের থাকা খাওয়ার জন্য গড়ে উঠেছে একাধিক বাঙালি রেস্টুরেন্ট। তবে সেসব রেস্টুরেন্টের ছাপি উঠেনি ছয় মাস ধরে। কলকাতা ও আসাম থেকে আসা কর্মচারীদেরও চালিয়ে রাখা কষ্টকর বিধায় বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে৷

একই অবস্থা ভেলোর, দিল্লী, মুম্বাই, হায়দারাবাদের অনেক হাসপাতাল কেন্দ্রিক উপশহরগুলোয়।

ধর্মীয় কাজে (যেমন মুসলমানরা আজমির যান আবার হিন্দুদের অনেকগুলো তীর্থস্থান আছে ভারতে) ভারত আসা বাংলাদেশীদের অভাবে অভাবে আছেন সেখানের ব্যবসায়ীরা।

পড়াশোনা করতেও বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী সেখানে যান। আর বছর জুড়ে ব্যবসায়ীরা ছাড়াও কেনাকাটা করতে অসংখ্য বাংলাদেশী ভারতে যান একা বা পরিবার নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের সিংহভাগই টিকে থাকেন, বাংলাদেশের পর্যটকদের ব্যয়ের ওপর। করোনার কারণে বাংলাদেশিরা যেতে না পারায় এখন বন্ধ হতে বসেছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

মারকুইস স্ট্রিট, রফি-আহমেদ কিদয় স্ট্রিট, ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট, নিউ-মার্কেট এলাকায় প্রায় ছোট-বড় তিন শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। রয়েছে বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের দোকানও। যার অধিকাংশই এখন বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশি পর্যটক না আসার কারণে।

সরকারি হিসেব বলছে, চিকিৎসা, পড়াশোনা, কেনাকাটা ও বেড়ানোর প্রয়োজনে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে প্রতিদিন সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার বাংলাদেশি পর্যটকের ৮০ শতাংশই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে থাকেন। বাংলাদেশি পর্যটকের অভাবে যেন খাঁ খাঁ করছে কলকাতার শপিংমলগুলো।

কলকাতা থেকে ভেলোর, শিলিগুড়ি থেকে রাজস্থানের সবারই প্রত্যাশা করোনা বিদায় হোক, লক্ষ্মী আসুক দেশে।

Facebook Comments

Related Articles