পানামা খালঃ পাহাড়ের উপর দিয়ে জাহাজ চলে যেখানে

পাহাড়ের উপর দিয়ে জাহাজ চলার কথা শুনে অনেকে ভাবছেন এটা কী করে সম্ভব? অনেকে আবার ভাবছেন হয়ত জাহাজের নিচে চাকা লাগিয়ে টেনে পাহাড়ে তোলা হয়। এর কোনটাই না। জাহাজ চলে স্বাভাবিকভাবেই। তাহলে কীভাবে একটা জাহাজ পাহাড়ে উঠে যায় সেটা নিয়ে নিশ্চয়ই সবার জানতে ইচ্ছে করছে! তাহলে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি।

পানামা খাল তৈরির আগে এশিয়া, ইউরোপ , আফ্রিকার জাহাজগুলো উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকুলে যাওয়ার জন্য পুরা দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে যেতে হত। কিন্তু পানামা বা নিকারাগুয়ার দিকে যদি ছোট একটা খাল কাটা হয় তাহলে জাহাজগুলো ১২০০০ কিলোমিটার পথ কম ঘুরেই উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকুলে পৌঁছাতে পারবে।
.


১৮৬৯ সালে ফরাসিরা মিশরে সুয়েজ খাল খনন করে । সুয়েজ খালের সাফল্য তাদেরকে উজ্জীবিত করে পানামা খাল খননে। ফরাসিরা বসে থাকার লোক না। সুয়েজ খালের আদলে তারা পানামা খালের প্রকল্প শুরু করে । কিন্তু কাজে হাত দিয়েই তারা বুঝতে পারে পরিকল্পনায় মারাত্মক ভুল আছে। কারণ পানামা খাল দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। পাথুরে পাহাড় কেটে খাল খনন করা সহজ কাজ নয়।

খাল না হয় কাটা যাবে। কিন্তু ফরাসিদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দেয় এর পরিবেশ। খাল কাটলেও পাহাড়ি ঢলে পলি জমে দ্রুতই আবার জাহাজ চলাচলের অনুপোযুগী হয়ে যাবে । ফরাসিদেরকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করে আমেরিকা । তারা ১৯০৩ সালে ফ্রান্স থেকে প্রকল্পটি কিনে নেয়। আমেরিকা নতুন ডিজাইনে কাজ শুরু করে ।

আগেই বলেছি পাহাড় কেটে সাগরের সমান করে ফেললেও সেটা উপযোগী হবে না । তাই আমেরিকানরা দিনরাত ভাবতে থাকে কীভাবে জাহাজ পাহাড়ের উপর দিয়ে চালানো যায়। বহু চিন্তা ভাবনার পর তারা একটা সমাধান বের করে ।

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে পানামা খালের উচ্চতা ৮৫ ফুট। এত উচুতে জাহাজ উঠানোর জন্য ব্লক বা লক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই ব্লক আবার আমি যেই সামুদ্রিক মাছের ব্লক বেচি তার মত না। এখানের ব্লকে পানি আটকানো হয়। অনেকটা স্লুইসগেটের মত। সবচেয়ে নিচের লকের পানি সমুদ্রের পানির লেভেলের সমান রাখা হয়। জাহাজ যখন আসে তখন নিচের লকের গেট খুলে দেওয়া হয়।
জাহাজ পুরাপুরি প্রথম তথা নিচের লকে ঢুকে গেলে পিছনের গেটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দিলে পানি আর লক থেকে বের হতে পারে না। তখন জাহাজটা যেই লকে অবস্থান করে সে লকে শক্তিশালী পাম্প দিয়ে পানি বাড়ানো হয়। মাত্র ১০ মিনিটের ভিতর লকের পানির উচ্চতা ২৫-৩০ ফুট বেড়ে যায়। অনেকটা জোয়ারের মত আর কি।

যখন নিচের লকের পানি দ্বিতীয় লকের পানির সমান হয়ে যায় তখন গেট খুলে দেওয়া হয়। জাহাজ তখন দ্বিতীয় লকে ঢুকে গেলে পিছনের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় । এখানেও আগের মতই পানির লেভেল বাড়ানো হয়। পানির লেভেল তৃতীয় লকের সমান হলে তৃতীয় লকের গেট খুলে দেওয়া হয়। জাহাজ তখন তৃতীয় লকে ঢুকে যায়। এভাবে সব লক পের হয়ে পাহাড়ের সমতলে কৃত্রিমভাবে তৈরি গাতুন লেকে পৌঁছে যায়।

লেক দিয়ে জাহাজ চলতে চলতে এক সময় আবার সাগরে নামার প্রয়োজন হয়। সেখানেও ৩টি লক পাড়ি দিয়ে জাহাজকে সাগরে নামতে হয়। নামার সময় জাহাজ যখন উপরের লকে ঢুকে তখন দুই দিকের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। লকের পানি কমিয়ে দ্বিতীয় লকের সমান করা হয় । সমান হলে জাহাজ দ্বিতীয় লকে ঢুকে যায়৷ আবার দ্বিতীয় লকের পানি কমিয়ে নিচের লকে নামানো হয়। এভাবে নিচের লক থেকে সাগরে নেমে যায়।

পানামা খাল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে বেশ মোটা অংকের শুল্ক দিতে হয়। এই শুল্ক থেকেই পানামার অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশের যোগান হয়৷

Facebook Comments