পাপিয়া সাহেদদের পরে এবার এলো লুপা কাহিনী

নাম তার লুপা তালুকদার। নুর নাজমা আক্তার লুপা তালুকদার। পেশায় তিনি সাংবাদিক। তার ভাষায় সিনিয়র সাংবাদিক। সাংবাদিকতা শুরু মাই টিভি দিয়ে। এখন মোহনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার (ক্রাইম)। একটি অনলাইন টিভির ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আরেকটি পত্রিকার সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে তিনি ‘কর্মরত’; বলছে তার ফেসবুক প্রোফাইল। যদিও এসব মিডিয়ার অধিকাংশই ভুইফোড়৷ তবে এসব ভালোই কাজে লাগিয়েছেন তিনি। লুপা তালুকদার বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য।

বাংলাদেশ আওয়ামী পেশাজীবি লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন তিনি দুই বছর ধরে। তার ছবি আছে প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামীলীগের সেকেন্ড ম্যান ওবায়দুল কাদের বা আরো অনেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে। অবিকল সাহেদ, সাবরিনা বা সেই পাপিয়ার মতোই।

এতক্ষণ ধরে যার ‘গুণগান’ জানলেন সেই লুপা তালুকদার একজন মেয়েশিশু পাচারকারী। টিএসসি থেকে নয় বছরের ফুটফুটে শিশু জিনিয়াকে অপহরণ করেছিলো এই লুপা তালুকদার। এক সপ্তাহ আগে টিএসসি থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে চেনা এক মুখ জিনিয়া। জিনিয়া নিঁখোজ হওয়ার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিশুটির খোঁজে সরব হয়ে ওঠেন।

অক্লান্ত চেষ্টায় নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর ফুলবিক্রেতা শিশু জিনিয়াকে নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ৷

“সাংবাদিকতার মুখোশের আড়ালে লুপা তালুকদার মূলত পথশিশুদের অপহরণ করে দেশে ও ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে বিক্রি করতো; আর লুপার এসব ক্রাইমের সঙ্গী ঢাকার স্বনামধন্য কিছু সাংবাদিক নেতা – যারা দীর্ঘদিন ধরে লুপাকে ব্যাকআপ সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে।

লুপার ক্রাইম পার্টনার হিসেবে ঢাকার কিছু স্বনামধন্য সাংবাদিক নেতা জড়িত, মোটা অঙ্কের মাসোহারা তারা লুপার কাছ থেকে নিয়মিত নিতো; লুপার নির্দিষ্ট একটি ক্যাডার বাহিনী আছে।” লিখেছেন অনলাইন এক্টিভিস্ট ও সাবেক ছাত্রলীগের নেতা রুদ্র সাইফুল।

জানা যায়, দীর্ঘদিন লুপা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইয়াবা বিক্রি করতো৷ লুপার ক্রাইম জোনের হেটকোয়ার্টার হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ। ইতিমধ্যে লুপার জন্য কিছু সাংবাদিক নেতা পুলিশের কাছে তদবির শুরু করে দিয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন নুর নাজমা আক্তার লুপা তালুকদার। তিনি রচনা করেছেন একাধিক সাহিত্যের বই।

এর আগেও লুপার নামে বহু প্রতারণার অভিযোগ আসলেও খতিয়ে দেখেননি কেউই। বরং এক শ্রেনীর সাংবাদিক নেতা আর আওয়ামীলীগের নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধের জালের বিস্তৃতি ঘটেছে দিনের পর দিন।

‘অগ্নি টিভি’ নদী বাংলা সৃষ্টিময় মিডিয়া লিমিটেড নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মালিক লুপা তালুকদার। অগ্নি টিভি নদী বাংলা সৃষ্টিময় মিডিয়া লিমিটেড ঢাকা বাংলামটর, ৫৫ সি আর দত্ত লেনের মোজাফফর টাওয়ারের ৫ম তলায় একটি অফিস খুলে বসেছেন। অগ্নি টিভি নামক একটি ফেসবুক পেজ খুলে প্রতিনিধি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। গতবছর এসব অভিযোগ আসলেও গুরুত্ব দেয়নি কেউই। এমনকি নামীদামী মিডিয়াগুলো খবরও প্রকাশ করেনি সব কিছু জানার পরেও।

১০ মাস আগে লুপা তালুকদারের ছেলের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। লয়েন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০ম শ্রেণির ছাত্র উদয় বিন নূর অগ্নির আত্মহত্যা এখন অধিকতর তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অগ্নির বন্ধুরা। পরীবাগের ৮/২ মোতালেব টাওয়ার-২ এ থেকে ঢাকায় পড়ালেখা করতো অগ্নি। পুলিশ ধারণা করছিল, অগ্নি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

পটুয়াখালী জেলার গলাচিপায় মা-মেয়ে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় লুপা তালুকদার সহ ৫ আসামিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০১৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অধিশাখা-১-এর উপসচিব মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশে আসামি মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, মোস্তাইনুর রহমান লিকন, হাকিম আলী, আলী হোসেন ও নাজনীন আক্তার লুপার বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তাদেরকে খালাসের নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার নথি ও ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান নান্না তালুকদারের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ নেয় উপজেলার ডাকুয়া গ্রামের হতদরিদ্র এক সন্তানের জননী শাহিনুর বেগম। ৪ বছরের মেয়ে সেলিনাকে নিয়ে ওই বাড়িতেই থাকতেন তিনি। সেখানে লুপার দুই ভাই ও স্বামী বাদল একাধিকবার শাহিনুরকে ধর্ষণ করে। ২০০৩ সালের ২৪ মে নিখোঁজ হয় শাহিনুর বেগম ও মেয়ে সেলিনা। ৩১ মে উপজেলার রামনাবাদ নদীর ডাঙ্গারখাল থেকে শাহিনুরের অর্ধগলিত বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করা হয়।

তবে মেয়ে সেলিনার লাশ আজও পাওয়া হয়নি। এ ঘটনায় ১ জুন ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৮-৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে গলাচিপা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন শাহিনুরের মা নিলুফা বেগম। একই বছরের ১৭ জুলাই ১১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে ২০০৫ সালে মামলাটি গেজেটভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে পটুয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে মামলাটি বরিশাল দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। মামলার বাদী নিলুফা বেগম জানান, ঘটনার রাতে (২০০৩ সালে ২৪ মে) ডাকুয়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে লুপা, লুপার ভাইসহ অন্যান্যরা শাহিনুর ও সেলিনাকে অস্ত্রের মুখে ট্রলারে তুলে নিয়ে যায়। বাদীর ধারণা শাহিনুর আসামিদের এমন কোনো গোপন বিষয় জেনে ফেলেছে যা ফাঁস হলে তাদের ক্ষতি হতে পারে। তাই পরিকল্পিতভাবে শাহিনুর ও তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

গতবছর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) জাতীয় পদক ২০১৯ পেয়েছেন সাংবাদিক লুপা তালুকদার। লুপার আরো অনেক অপকর্ম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বের করতে পারবে বলেই বিশ্বাস অনেকের।

Facebook Comments

Related Articles