ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পদ হারানোর এক বছরঃ জাবির ভুমিকা ও ঘটনাপ্রবাহ

১৪ সেপ্টেম্বর,২০২০ঃ ঠিক এক বছর আগে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ দুই নেতা রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে নানান অভিযোগে সরে যেতে হয়। বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও মূলত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নালিশের প্রেক্ষিতেই তাদের সরে যেতে হয়, এরকম বক্তব্য অপসৃতদেরও। জাহাঙ্গীরনগরে এসে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের হাত পোড়ার ঘটনার কিছু আদ্যপ্রান্ত তুলে ধরা হল। ঘটনা প্রবাহ বর্ননা মিডিয়ায় আসা ঘটনা, সাক্ষাৎকার এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে করা হয়েছে।

ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই জনকে কেন্দ্র করে সাধারণত দুইটি আলাদা বলয় সৃষ্টি হয় সকল ইউনিটেই। প্রতি ইউনিটের শীর্ষ দুই নেতার একজন কেন্দ্রীয় সভাপতির ‘ম্যান’ হলে অপরজন সাধারণ সম্পাদকের ‘ম্যান’৷ তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শীর্ষ নেতাই ছিলেন ততকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি শোভনের অনুসারী।

একনেকে পাস হওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাস্টারপ্লানের যে প্রকল্প নেওয়া হয়- এর আওতায় গতবছর পাঁচটি হল নির্মানের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুইটি মেয়েদের হল এবং তিনটি ছেলেদের হল নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করলেও কাজ পায় পূর্বনির্ধারিত ঠিকাদার। ঠিকাদারদের শিডিউল ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে, এক ঠিকাদার লিখিতভাবে সেসব জানান। ততকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এক ঠিকাদারের জন্য তদবির করলেও সে তদবির উপেক্ষিত হয়। কথা থাকলেও ঠিকাদারদের শিডিউল ছিনতাইয়ের কোন বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি।

ছেলেদের তিনটি দশতলা বিশিষ্ট হল নির্মাণের জন্য বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের তিনপাশ নির্ধারিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করে৷ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন এই হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হওয়ায় প্রথম দিকে তার পরামর্শে ছাত্রলীগের শিক্ষার্থীরাও এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহন করে। মূলত তখন ভিসিকে ‘চাপ’ দিয়ে ফায়দা লুটতেই সে এসব করে। তবে শিক্ষার্থীরা মন থেকেই অপরিকল্পিত উন্নয়নের প্রতিবাদ জানাতে থাকে। পরিবেশবাদী সংগঠন, সাংস্কৃতিক জোট ও বাম জোটের শিক্ষার্থীরাও আলাদাভাবে মাস্টারপ্লানের ‘গলদ’ সুরাহার দাবীতে আন্দোলনে নামে। উপাচার্য সবার কথা শুনে দাবী মানার আশ্বাস দিলেও তিনি পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল থেকে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।

এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলের সাথে তার রাজনৈতিক পূর্বসূরি রাজীবের বিরোধ চলছিল৷ রাজীব চঞ্চলকে চাপে রাখতে নানামুখী কার্যকলাপ চালাচ্ছিলেন, যার প্রেক্ষিতে তিনি চঞ্চলের হাতে একসময় প্রহৃত হন। রাজীবের অন্যান্য শিষ্যরা চঞ্চলকে ত্যাগ করেন। যদিও ত্যাগের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন, সহ সভাপতি তাজ ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামীমের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে তৃতীয় শক্তির উত্থান হয়। এই শক্তি গোলাম রাব্বানীর কাছে যায় এবং ক্যাম্পাসের আসন্ন বড় বাজেটের বিস্তারিত তুলে ধরে রাব্বানীকে প্রলুব্ধ করে। রাব্বানী উপাচার্যকে ফোনে জানায় তার প্যানেলকে অর্ধেক ভাগ দিতে।

মিডিয়ায় দেওয়া সাদ্দামের ভাষ্যমতে, এক কোটি টাকার অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতিকে, বাকি অর্ধেক তার প্যানেল ও চঞ্চলের প্যানেলকে সমহারে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এবং তারা যথারীতি সে টাকা পায়। গত কোরবানির ঈদের আগেই নেতাকর্মীরা ‘সালামি’ নিয়ে বাড়ি যায়।

তবে এসব টাকার ভাগ বাটোয়ারায় অনেক নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ হয়। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক চঞ্চলের কর্মীদের ‘ন্যায্য’ ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দামের বিরুদ্ধেও বঞ্চিত করার অভিযোগ আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের কাছে এসব তথ্য চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টেও অস্বাভাবিক লেনদেন হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ হয়। তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ভিসি ও সহকারী প্রক্টরের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আসে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে অপরিকল্পিত উন্নয়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে চলে যায়। ভিসি শিক্ষার্থীদের সাথে ১২ সেপ্টেম্বর বৈঠকে বসেন। বৈঠকে হল নির্মাণের স্থান পুনঃনির্ধারনের সিদ্ধান্ত হলেও উপাচার্য তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি যুক্তি দেখান তিনি নিজের বিরুদ্ধে নিজে তদন্ত করতে পারেন না। আন্দোলনকারীদের মনে সন্দেহ বেড়ে যায়। তখন পর্যন্ত কোন ফোনালাপ ফাঁস হয়নি বা আন্দোলনকারীরা ভিসির সাথে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের বৈঠকের খবর জানেন না।

এর ঠিক দুইদিনের মাথায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতৃত্বকে সরে যেতে হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, উপাচার্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের চার থেকে ছয় শতাংশ চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দেয়ায় খারাপ আচরণ করছে বলে অভিযোগ করেন।

যদিও কিছুদিন আগে, ২০১৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দলের সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার বোর্ডের সভায় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি তাদের কমিটি ভেঙে দেওয়ার কথা বলেন। পরে শোভন-রাব্বানীর গণভবনে প্রবেশের স্থায়ী পাসও বাতিল করা হয়।

এর এক সপ্তাহ পরে ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামীলীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভার বৈঠকে ছাত্রলীগের দুই নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। সর্বশেষ তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের পার্সেন্টেজ চাইতে গিয়েছিল। ভিসি তাতে রাজি না হওয়ায় উল্টো তাকেই দোষারোপ করার চেষ্টা করেছে। তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলেছে। এরা (শোভন-রাব্বানী) আসলে মনস্টার হয়ে গেছে। এদের আর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকার দরকার নেই।’

এরপরই তিনি শোভন-রাব্বানীকে অব্যাহতি দিয়ে প্রথম সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ঘোষণা দেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সরে যাওয়ার পরেও জাহাঙ্গীরনগরকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা থেমে ছিলনা। একের পর এক ফোনালাপ ফাঁস, খোলা চিঠি, সাংবাদিক ডেকে উপাচার্যের সবিস্তারে ঘটনার বর্ননায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। গোলাম রাব্বানী ও জাবিতে তার অনুগত প্যানেল ভিসির বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ তুলেন। জাবি ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা মূলত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ রাসেলের নির্দেশে মিডিয়ায় ভিসির বিরুদ্ধে কথা বলেন।

অভিযোগ আসে ভিসির স্বামী ও ছেলের বিরুদ্ধেও। শিক্ষামন্ত্রী থেকে সরকারপ্রধান সবাই জাহাঙ্গীরনগর নিয়ে কথা বলেন। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও হল ভ্যাকেন্ট ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে করোনায় আবারও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। করোনার মধ্যেও শুরু হয়ে যায় উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ।

Facebook Comments

Related Articles