যেকোন প্রিলি,রিটেন,ভাইভার জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ : মুক্তিযুদ্ধ

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন : 

  • অসহযোগ আন্দোলন ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালিত আন্দোলন। এ আন্দোলনে কেন্দ্রীয় শাসনের বিপরীতে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে দিগনির্দেশনামূলক ভাষণের মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ বিভিন্ন নির্দেশের মাধ্যমে এ আন্দোলন পরিচালনা করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু সরকার গঠনে আহবান জানানোর পরিবর্তে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এ সিদ্ধান্তকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দেন এবং এর প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহবান করেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জনগণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তরে সামরিক সরকারের গড়িমসি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপল্স পার্টির সরাসরি অসহযোগিতার ফলে শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এর বিস্তৃতি ছিল সম্পূর্ণ পূর্ব পাকিস্তান ব্যাপী। অসহযোগ আন্দোলনের পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং নয়মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতেই ২ মার্চ ছাত্র সংগঠনগুলি ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। সরকারি নির্দেশে গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল এস এম আহসানের পরিবর্তে প্রাদেশিক সামরিক আইন প্রশাসক লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে গর্ভনরের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সরকার সামরিক আইন বিধি জারি করে সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এছাড়া সন্ধ্যা ৭ টা থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত কার্ফু্ জারি করা হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে পরদিন থেকে সকল সরকারি অফিস, সচিবালয়, হাইকোর্ট ও অন্যান্য আদালত, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, পিআইএ, রেলওয়ে এবং অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যম, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহে হরতাল ঘোষিত হয়। শেখ মুজিবের উদ্দেশে একটি প্রচারপত্রে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার আহবান জানায়। এছাড়া ন্যাপ, জাতীয় শ্রমিক লীগ আন্দোলনে একাত্মতা জানায়। ন্যাপ (মো) পল্টনে এবং জাতীয় লীগ বায়তুল মোকাররমে প্রতিবাদ সভা করে। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিততে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘স্বাধীনতার ইশতাহার’ ঘোষণা করে। এতে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর তিনটি লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা হয়: বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ, বৈষম্যের নিরসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। আর আন্দোলনের ধারা হিসেবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলা হয়। স্বাধীন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা …’ গানটি নির্বাচন করা হয়। সমগ্র প্রদেশে ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বসার দিন জাতীয় শোক দিবস পালিত হয়। ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন অর্ধবেলা হরতাল আহবান করা হয়। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালিত হতে থাকে। শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক সহ সকল পর্যায়ের জনগন আন্দোলনে যোগ দেয়। সরকার সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সহায়তায় আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। ঢাকা, টঙ্গী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর, খুলনাসহ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনীর গুলিতে বহু লোক হতাহত হয়। ৪ মার্চ ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাঙালির অধিকার দাবি করেন। পিডিপি এবং জামায়াতে ইসলামী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আহুত ১২ তারিখের গোলটেবিল আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পশ্চিম পাকিস্তানে তেহরিক-ই- ইশতেকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব) আসগর খান খুব দ্রুত আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহবান জানান। এ ছাড়া বেলুচিস্তান ন্যাপ অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে ১২ মার্চ সেখানে হরতাল আহবান করে। এদিন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন অসহযোগ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে। এদিন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক সাহেবজাদা ইয়াকুব খান পদত্যাগ করেন। ৫ মার্চ  আওয়ামী লীগ কর্মিরা লাঠি হাতে বিক্ষোভ মিছিল করে। ছাত্রলীগ, বাংলা ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা পড়ে। পাকিস্তান লেখক সংঘ, পূর্ব পাকিস্তান সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতি এদিন বিক্ষোভ মিছিল করে। পাকিস্তান পিপল্স পার্টির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়াকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করা হয়। ৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় আহবান করেন। তবে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে নিয়োগের ঘোষণা এবং জাতির উদ্দেশে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের বক্তৃতায় আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারের বর্বরতার পক্ষে সাফাই বাঙালিদের বিক্ষুব্ধ করে। শেখ মুজিব এদিন দলীয় হাইকমান্ড এবং ছাত্রলীগের সঙ্গে বৈঠক করেন। আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে জাতীয় লীগ, মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে ন্যাপ, অলি আহাদ, শ্রমিক নেতা কাজী জাফর আহমদ পৃথকভাবে সমাবেশ করে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহবান জানায়। সাংবাদিক ইউনিয়ন, শিক্ষক সমিতি, মহিলা পরিষদ, ছাত্র ইউনিয়ন, কৃষক-শ্রমিক সমাজবাদী দল প্রতিবাদ সমাবেশ করে। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এক দিগনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন। এ ভাষণের মূল বিষয় ছিল চারটি, যথা, ক) চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার, খ) সৈন্যদের ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া, গ) সারাদেশে হত্যাকান্ডের তদন্ত করা এবং ঘ) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

এ ছাড়া একই দিন তিনি পরবর্তী সপ্তাহের আন্দোলনের জন্য ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। অফিস-আদালত, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারি প্রেসনোটে অসহযোগ আন্দোলনের ৬ দিনে ১৭২ জন নিহত এবং ৩৫৮ জন আহতের কথা প্রচার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি সংগ্রামের জন্য সকলকে প্রস্ত্তত হতে এবং সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের আহবান জানান।

৭ মার্চের পরে অসহযোগ আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সকল শাখা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তাদের নির্দেশাবলি পালন করতে থাকে। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহবান জানায়। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আযম এদিন পিপল্স পার্টি এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর সমালোচনা করেন। ৮ মার্চ তাজউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সরকারি প্রেসনোট প্রত্যাখ্যান করে একে মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেন। ছাত্রলীগ ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ৯ জন সদস্য এবং আহবায়ক ও সম্পাদকসহ মোট ১১ জনকে নিয়ে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এ সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া এদিন ফরওয়ার্ড স্টুডেন্ট ব্লক ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাঙলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার জন্য ‘বাঙলা মুক্তিফ্রন্ট’ গঠনের আহবান জানিয়ে প্রচারপত্র বিলি করে। এ ছাড়া এদিন গেরিলা যুদ্ধের নিয়মকানুন সম্পর্কিত লিফলেট ছড়ানো হয়। এদিন পিডিপি প্রধান নূরুল আমিন এবং কিউএমএল নেতা আবদুস সবুর খান দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের আহবান জানান। ৯ মার্চ তাজউদ্দিন আহমদ বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৬ টি নির্দেশ জারি করেন। অসহযোগ আন্দোলনের এ পর্যায়ে প্রদেশের প্রধান বিচারপতি বি.এ সিদ্দিকী নবনিযুক্ত গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ করাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আতাউর রহমান খান শেখ মুজিবকে জাতীয় সরকার গঠনের আহবান জানান। মওলানা ভাসানী ন্যাপের ১৪ দফা ঘোষণা করেন এবং আজাদী রক্ষায় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আন্দোলনের কথা বলেন। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) অসহযোগ আন্দোলনের পরিবর্তে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার আহবান জানায়। এছাড়া পুলিশ, ইপিআর, আইবি, সিআইডিকে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহবান জানানো হয়। ১০ মার্চ অভিনেতা ও কলাকুশলীরা ‘বিক্ষুদ্ধ শিল্পী সমাজ’ নামে গোলাম মোস্তফা এবং খান আতার নেতৃত্বে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সিভিল সার্ভিসের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা আওয়ামী লীগের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। সরকার আন্দোলন মোকাবেলায় সামরিক বিধি জারি করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং সশস্ত্রবাহিনীর গতিবিধিতে অন্তরায় সৃষ্টি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করে। ১১ মার্চ তাজউদ্দিন আহমদ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা সংক্রান্ত আরও কিছু নির্দেশ জারি করেন। প্রদেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রের সকল নির্দেশ সমগ্র প্রদেশে পালিত হতে থাকে। কবি আহসান হাবীব, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন প্রমুখ সরকারের খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ খেতাব বর্জন করেন। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-যুবক সশন্ত্র প্রস্ত্ততি ও প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সৈন্য এবং আধাসামরিক বাহিনী তথা ইপিআর, পুলিশ, আনসারদের মধ্যেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রত্যেক জেলা, মহকুমা, থানা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগ্রাম-প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। সারা প্রদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, খাজনা-ট্যাক্স আদায় বন্ধ হয়ে যায়। সরকার নতুন নতুন সামরিক আইন জারি করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সরকারের আদেশ অমান্য করে আন্দোলন অব্যাহত থাকে। শুধু দেশে নয় বহির্বিশ্বেও অসহযোগ আন্দোলন ব্যাপক প্রচার পায়। ১১ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট পূর্ব পাকিস্তান থেকে জাতিসংঘের সকল কর্মচারীকে সদরদপ্তরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

১২ মার্চ আওয়ামী লীগ প্রদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। পূর্ব পকিস্তানের সিএসপি অফিসার এবং প্রথম শ্রেণির ইপিসিএস কর্মকর্তাবৃন্দ অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। এদিন সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা আন্দোলনে যোগ দেয়। পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রদর্শকগণ অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। ১৩ মার্চ সরকার সামরিক বিধি জারি করে প্রতিরক্ষা খাতের বেতনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৫ মার্চ সকাল ১০ টায় চাকরিতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং অমান্যকারীদের বরখাস্ত এবং সামরিক আদালতে বিচারের ঘোষণা দেয়। ১৪ মার্চ করাচিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো পূর্ব ও পশ্চিমের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলসমূহের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করেন যা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। প্রাক্তন গভর্নর আযম খান, ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান, জমিয়াতুল উলেমা-ই- ইসলাম নেতা মুফতি মাহমুদ, কাউন্সিল লীগ নেতা মিয়া মমতাজ দৌলতানা, সরদার শওকত হায়াত খান, মওলানা শাহ আহমদ নূরানী, কনভেনশন লীগের জামাল মোহাম্মদ কোরেজা, জামায়াতে ইসলামীর আবদুল গফুর, সরদার মওলা বক্স সুমরো প্রমুখ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা শেখ মুজিবকে সমর্থন করে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহবান জানান। তবে মুসলিম লীগের আবদুল কাইয়ূম খান আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেন। শেখ মুজিব সামরিক নির্দেশের জবাবে জীবনের বিনিময়ে ভবিষ্যৎ বংশধরদের স্বাধীনভাবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বসবাসের নিশ্চয়তার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাজউদ্দিন আহমদ সরকার পরিচালনার জন্য ৩৫ দফা ভিত্তিক নির্দেশনামা জারি করেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সম্পদ পাচার রোধের অংশ হিসেবে ঢাকার কয়েকটি স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন করে। ঢাকার পত্রিকাগুলি ‘আর সময় নেই’/ ‘Time is Running Out’ শিরোনামে যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ভুট্টোর দুই সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমালোচনা করে নূরুল আমীন, আবুল হাশিম, ওয়ালী খান প্রমূখ এ দাবি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশের পর পূর্ব পাকিস্তানে সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ মূলত অকেজো হয়ে যায়। সেনাবাহিনী ছাড়া সর্বত্র আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রবল আন্দোলনের চাপে সরকার এ সময় আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস জি এম পীরজাদা, মেজর জেনারেল খোদাদাদ খান, মেজর জেনারেল গোলাম ওমর, বিচারপতি এ আর কার্নেলিয়াস, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এম এম আহমদ এবং কর্নেল হাসান সহ ঢাকায় আসেন। ১৬ মার্চ থেকে ঢাকায় ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা শুরু হয়। তবে বৈঠকের বাইরে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করেন। ১৭ মার্চ পুনরায় আলোচনা চলে। তবে এ সম্পর্কে সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ বিস্তারিত কিছু প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। মওলানা ভাসানী এদিন চট্টগ্রামের জনসভায় ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসের পরিবর্তে ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা দিবস’ পালনের আহবান জানান।

সরকার সেনাবাহিনী তলব ও হত্যাকান্ড সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত একজন বিচারপতি, একজন ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার সামরিক কর্মকর্তা, একজন সিএসপি অফিসার, একজন পুলিশ অফিসার এবং ইপিআরের কর্নেল পদমর্যাদার একজনকে নিয়ে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে।

১৮ মার্চ আওয়ামী লীগ সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পেশের জন্য গঠিত তদন্ত কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে। পক্ষান্তরে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং আবিদুর রেজার সমন্বয়ে ৩ সদস্য বিশিষ্ট পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তেজগাঁয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে এ ধরনের উস্কানি বাঙালিরা সহ্য করবে না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এদিন ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকের বিরতি। ১৯ মার্চ ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক হয় এবং পরদিন উভয় পক্ষের উপদেষ্টাসহ আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। পৃথকভাবে উভয়পক্ষের উপদেষ্টামন্ডলীর বৈঠক হয়। প্রেসিডেন্টের পক্ষে এ আর কার্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামাল হোসেন এবং তাজউদ্দিন আহমদ অংশ নেন। পরদিনের আলোচনার ভিত্তি সম্পর্কে তাঁরা এ বৈঠক করেন বলে জানানো হয়। আলোচনা চলা অবস্থায় রংপুর ও সৈয়দপুরে পাকিস্তানি সৈন্যরা সাধারণ জনগণের ওপর গুলিবর্ষণ করে। তবে জয়দেবপুরে জনতা পাকসৈন্যদের গুলিবর্ষণের মুখে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করতে গেলে তারাও প্রতিবাদে অংশ নেয়।

২০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের ৬ জন প্রতিনিধি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, কামাল হোসেন, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলী এবং ইয়াহিয়া খান ও তাঁর প্রতিনিধি এ আর কার্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসানের সঙ্গে দুবার বৈঠক হয়। শেখ মুজিব আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির কথা বলেন এবং পরদিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক ও উপদেষ্টাদের পুনঃবৈঠকের কথা জানানো হয়। সরকার এদিন বেসামরিক জনগণের কাছে থাকা লাইসেন্সকৃত অস্ত্র থানায় জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়। শেখ মুজিব এদিন মমতাজ দৌলতানা, মুফতি মাহমুদ প্রমুখের সঙ্গে বৈঠক করেন।

২১ মার্চ ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকে তাজউদ্দিন আহমদ শেখ মুজিবকে সহায়তা করেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১২ জন উপদেষ্টাসহ আলোচনায় যোগ দিতে ঢাকা আসেন। শেখ মুজিব এদিন মওলানা ভাসানীর কাছে দূত পাঠান। ভাসানী চট্টগ্রামের পোলো গ্রাউন্ডে জনগণকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১ দফার আন্দোলনে যোগ দেয়ার আহবান জানান। ন্যাপ ২৩ মার্চ ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা দিবস’ এবং ছাত্রলীগ ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালন উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় পথসভা করে।

২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় স্থগিত করেন। এদিন মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনা হয়। প্রেসিডেন্টের ৪ জন উপদেষ্টার সঙ্গে পিপল্স পার্টির ৫ জন আইন বিশেষজ্ঞের আলোচনা হয়। তাঁরা আইনগত জটিলতার কথা বলে অধিবেশনের পূর্বেই প্রেসিডেন্টের ঘোষণার মাধ্যমে সামরিক আইন প্রত্যাহার ও ক্ষমতা হস্তান্তরে আওয়ামী লীগের দাবির বিরোধিতা করেন। এছাড়া ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানি অন্য নেতাদের সঙ্গেও এদিন আলোচনা করেন।

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দিনটিকে ‘প্রতিরোধ দিবস’ এবং ন্যাপ (ভাসানী) ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা দিবস’ হিসেবে পালন করে। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। ‘জয়বাংলা বাহিনী’র সদস্যরা ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে নতুন পতাকাকে অভিবাদন জানায়। ন্যাপ (ভাসানী), জাতীয় লীগ, ছাত্র সংগঠনগুলো এবং পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনে শরিক হয়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে প্রেসিডেন্ট এদিন জাতীয় দিবসের নির্ধারিত বেতার ভাষণ বাতিল করেন। ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার অংশ হিসেবে এদিন আওয়ামী লীগের আলোচকবৃন্দ এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের মধ্যে আলোচনা হয়। আওয়ামী প্রতিনিধি দলে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ এবং কামাল হোসেন। আর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন এ আর কার্নেলিয়াস, এস জি এম পীরজাদা এবং কর্নেল হাসান। আওয়ামী প্রতিনিধিরা এদিন প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রের খসড়া উপস্থাপন করেন। ৬ দফার ভিত্তিতে প্রণীত  এ খসড়ায় প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, মুদ্রা, নাগরিকত্ব, কেন্দ্রীয় ঋণ, ওজন ও পরিমাপের মানদন্ড, কেন্দ্রীয় সম্পদ, আন্তর্জাতিক ও আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগ কেন্দ্রের হাতে রেখে এর বাইরে অন্য সকল বিষয় প্রদেশের অধীনে রাখার সুপারিশ করা হয়। খসড়ার অর্থনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে এদিন সন্ধ্যায় তাদের মধ্যে পুনরায় বৈঠক হয়।

২৪ মার্চ খসড়া শাসনতন্ত্রের অর্থনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে সকাল এবং সন্ধ্যায় উভয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে দুদফা আলোচনা হয়। এ সময় আওয়ামী প্রতিনিধিরা খসড়ায় ‘ফেডারেশন’-এর পরিবর্তে ‘কনফেডারেশন’ প্রস্তাব করলে এতে আওয়ামী লীগের নীতিগত মৌলিক পরিবর্তন বলে সরকার পক্ষ প্রতিবাদ করে। এদিন উভয়পক্ষের বিশেষজ্ঞদের খসড়ার সব অনুচ্ছেদ ও তফসিলের ওপর দফাওয়ারি আলোচনা শেষ হয়। এরপর তাজউদ্দিন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন যে, বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তাই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আর আলোচনার প্রয়োজন নেই। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শেখ মুজিব সাংবাদিক সম্মেলনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, চাপের মুখে কোনো সিদ্ধান্ত বাঙালিরা মেনে নেবে না। তিনি আন্দোলন আরো দৃঢভাবে পরিচালনার নির্দেশ দেন। এদিন জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা হয়। তবে অধিকাংশ পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিক, বিশেষজ্ঞ ও উপদেষ্টা এদিন পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন।

২৫ মার্চ আওয়ামী লীগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পূর্বে জারিকৃত প্রশাসন পরিচালনার নির্দেশে সংযোজন-সংশোধন করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের সময় জনতার বাধায় পাকবাহিনী গুলি চালায়। এ ঘটনায় বিক্ষোভ চরম রূপ নিলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুলিবর্ষণ ও সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। সৈয়দপুর, রংপুর ও জয়দেবপুরে সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ২৭ মার্চ সমগ্র প্রদেশে হরতাল আহবান করে। এদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে খসড়া শাসনতন্ত্রের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপনের নির্ধারিত বৈঠক হয় নি। সংকটের সমাধানের পরিবর্তে ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। আন্দোলন দমনের নামে অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাসহ সমগ্র প্রদেশে জনগনের উপর নির্বিচার আক্রমণ চালায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণ  

  • ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক ভাষণ। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে  আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন এবং ১ মার্চ অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানের বিশাল জনসভায় তিনি সারা পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই আন্দোলনের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সমবেত উত্তাল জনসমুূদ্রে জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দান করেন। পূর্ণ ভাষণটি নিম্নে সন্নিবেশিত হলো:

আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।

আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম, নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলী বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করবো এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলবো, এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস; বাঙলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে দশ বৎসর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ছয়দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পর যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন। আমরা মেনে নিলাম।

তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলীতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলীর মধ্যে আলোচনা করবো; এমনকি আমি এ পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।

জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরও আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করলাম, আপনারা আসুন বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসেন, তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলী। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে। যদি কেউ এসেম্বলীতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলী চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলী বন্ধ করে দেওয়া হলো।

ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসাবে এসেম্বলী ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্দুকের মুখে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।

আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।

কি পেলাম আমরা? যে আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে, তার বুকের উপর হচ্ছে গুলী। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু। আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টেলিফোনে আমার সঙ্গে তার কথা হয়। তাকে আমি বলেছিলাম, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলী করা হয়েছে, কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ১০ই তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব।

আমি বলেছি, কিসের বৈঠক বসবে, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।

ভাইয়েরা আমার,

২৫ তারিখে এসেম্বলী কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে, ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। এসেম্বলী কল করেছে। আমার দাবি মানতে হবে: প্রথম, সামরিক আইন মার্শাল ল’ উইথ্ড্র করতে হবে, সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে, আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেম্বলীতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলীতে বসতে আমরা পারি না।

আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমিগভর্ণমেণ্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না।

২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল,- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলী চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।

আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর এই সাতদিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়ে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না। মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান বাঙালি অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিও টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনেন, তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নিবার পারে। কিন্তু পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ববাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ পাঠাতে চালাবেন। কিন্তু যদি এদেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝে শুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্ত্তত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় বাংলা।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ (বাংলার ম্যাগনাকার্টা/বাংলার মুক্তির সনদ)

———————————————

★ তারিখ: ৭ই মার্চ ১৯৭১ সাল(রবিবার)

★ শুরুর :বিকেল ৩টা ২০মিনিট।

★ স্থান : তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা।

★ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ভিডিও রেকর্ড ওকরেন,

    ” আবুল খায়ের” ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পাকিস্তান

     ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম কর্পোরেশন। তিনি এ ভাষণটি

     রেকর্ড করার জন্য ২০১৪ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা

     দিবস পদক লাভ করেন।

★ ৭ মার্চের ভাষণের সাউন্ড রেকর্ডকারী-

     এ এইচ খন্দকার।

★ ভাষণের স্থায়িত্ব : ১৯ মিনিট/১৮ মিনিট।

★মোট শব্দ : ১১০৮টি

★ ভাষণটি অনূদিত হয়েছে :১২ টি ভাষায়।

★ রেসকোর্সে উপস্থিত ছিল: প্রায় ১০ লাখ মানুষ।

★ মাইকের নাম-“কল রেডি”।

★ ভাষণে উপস্থাপন করা হয় : ৪ দফা দাবি।

★ দাবি ৪ টি হলো:

        ১. সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে।

        ২. সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।

        ৩. এই গণহত্যার তদন্ত করতে হবে।

        ৪. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নিকট ক্ষমতা

             হস্তান্তর করতে হবে

★ মূল বক্তব্য: “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম,

                       এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার

                        সংগ্রাম”।

★উল্লেখযোগ্য অংশ : “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও

                   দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো

                    ইনশাল্লাহ”

★এই  সময় ৩ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন

      চলছিলো।

★ ভাষণের প্রেক্ষাপট :১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী এই দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে ১লা মার্চ এই অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। এই সংবাদে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ সারাদেশে একযোগে হরতাল পালিত হয়। তিনি ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই পটভূমিতেই ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বিপুল সংখ্যক লোক একত্রিত হয়; পুরো ময়দান পরিণত হয় এক জনসমুদ্রে। এই জনতা এবং সার্বিকভাবে সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন।

★ ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর UNESCO এই ভাষণকে

     Memory of the World Register এর অন্তর্ভুক্ত

     করে।

    – ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিটি (IAC)

      ১৩০টি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল, নথি ও

      বক্তৃতার মধ্যে ৭৮টি বিষয়কে নির্বাচিত করে, এর

       মধ্যে ৭ মার্চ ভাষণের অবস্থান ৪৮তম

   – ফ্রান্সের প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী

     প্রতিনিধি মোঃ শহিদুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ

      জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বাংলাদেশের পক্ষ

      থেকে ৭ মার্চ ভাষণের স্বীকৃতির জন্য ১২ পৃষ্ঠার

      একটি আবেদন পত্র প্রেরণ করেন।

 – স্বীকৃতির স্বপক্ষে ১০টি প্রয়োজনীয় তথ্য, নথি ও

    প্রমাণপত্র জমা দেয়া হয়।

★ প্যারিসে ইউনেস্কো কার্যালয়ে অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা

     দেন মহাপরিচালক ইরিনা বেকোভা।

★ ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জ্যাকব এফ ফিল্ডের ভাষণ

     সংকলন “The Speech the Inspired History”

     এ বিশ্বের সেরা ৪১টি ভাষণের মধ্য স্থান পেয়েছে ৭ই

      মার্চের ভাষণ।

★ জ্যাকবের বইয়ে ভাষণটির শিরোনাম দেয়া হয়েছে

     The Struggle : This Time is the Struggle for

     Independence.

 ★বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট

     আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ বক্তৃতার সাথে

     তুলনা করা হয়

★”শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ কেবল

     একটি ভাষণ নয়,এটি একটি অনন্য রণকৌশলের

     দলিল” উক্তিটি করেছেন –কিউবার অবিসংবাদিত

     নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো।

★ “৭ মার্চের ভাষণ আসলে ছিল স্বাধীনতার মূল

      দলিল” উক্তিটি করেছেন–বর্ণবাদবিরোধী নেতা

      নেলসন ম্যান্ডেলা।

★১৩ নভেম্বর ২০১৭-তে ঐতিহাসিক এ ভাষণের উপর

    একটি বিশ্লেষণধর্মী বই “বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ:

     রাজনীতির মহাকাব্য” শিরোনামে আইসিটি

     মন্ত্রণালয় থেকে ই-বুক ও মোবাইল অ্যাপ হিসেবে

     উদ্বোধন করা হয়।

২৫ মার্চের হত্যাকান্ড ও জনপ্রতিরোধ

একাত্তরের ২৫ মার্চে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুধু একটি রাতের হত্যাকাণ্ডই ছিল না, এটা ছিল মূলতঃ বিশ্ব সভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক জঘন্যতম গণহত্যার সূচনামাত্র। এর প্রত্যক্ষদর্শীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির লেখায় উঠে এসেছে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের ভয়াবহ সব বর্ণনা।

অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখা থেকে জানা যায়, শুধুমাত্র পঁচিশে মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। পরবর্তী নয় মাসে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে ৩০ লাখ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পূর্ণতা দিয়েছিল সেই বর্বর ইতিহাসকে।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ রাত সর্ম্পকে লিখেছেন, সে রাতে ৭ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার হলো আরো ৩ হাজার ব্যক্তি। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চললো মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক- শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।

পাইকারি এই গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তনের সঙ্কট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয়, “১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।”

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানী জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রক্রিয়া চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালী বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সকল সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা।

পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত।

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত আবাসনের ২৪নং বাড়িতে। ওই বাড়ির নিচে দুপায়ে গুলিবিদ্ধ দুই মা তাদের শিশু সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছিল তাদের রক্তে। পাক হায়নারা ভেবেছিল অন্য কোন দল হয়ত অপারেশন শেষ করে গেছে। তাই তারা আর ওই বাড়িতে ঢোকেনি। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন প্রাণে বেঁচে যান।

২০১৪ সালের ১৪ই ডিসেম্বর প্রকাশিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সুলতান মাহমুদ রানার একটি লেখা থেকে জানা যায়, ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চুপিসারে করাচির পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। এই নির্দেশের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। এটি বাঙালিদের জন্য ছিল একটি ‘কালরাত্রি’।কারণ সৈন্যরা মধ্যরাতের পর থেকেই নির্বিচারে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে আরম্ভ করেছিল। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের এই পরিকল্পনাটি কার্যকর করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার টিক্কা খান। তারই নির্দেশে ২৫ মার্চের মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকবাহিনী বাংলাদেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই রাতে শুধু সাধারণ মানুষের ওপর নয়, প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয় বাঙালি নিরাপত্তাকর্মীদের ওপরও। সৈন্যবাহিনীর বাঙালি সদস্য, ইপিআর এবং পুলিশদের খতম করা ছিল পশ্চিমাদের একটি বড় লক্ষ্য। ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানায় এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনী যথাক্রমে বাঙালি পুলিশ, ইপিআর এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (ইবিআর)-এর সৈন্যদের গণহারে হত্যা করতে শুরু করে।

এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল গণহত্যা এবং অগ্নিসংযোগ। প্রথমেই পুরো ঢাকা শহরে হামলা চালানো হয়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হত্যা করে জগন্নাথ হল, রোকেয়া হলসহ বিভিন্ন জায়গায় গণকবর দেয়া হয়। ওই রাতে অনেক শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক এ এন এম মনীরুজ্জামান, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. ফজলুর রহমান খান, ড. এ মুকতাদির, শরাফাত আলী, এ আ কে খাদেম, অনুদ্ধেপায়ন ভট্টাচার্য, সা’দত আলী, এম এ সাদেক প্রমুখ। এ ছাড়াও ওই রাতে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল, ফজলুল হক, ঢাকা হল, এস এম হলের অনেক আবাসিক ছাত্রকে হত্যা করা হয়। শুধু ঢাকা শহরে সেদিন কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল তার হিসাব পাওয়া যায়নি। কারণ অনেক দেহ পুড়ে গিয়েছিল বা গণকবর দেয়া হয়েছিল। তবে সে সংখ্যা কমপক্ষে দশ হাজারের বেশি হবে। গণহত্যার এই বীভৎস দৃশ্য দেখলে পাগল হওয়ার উপক্রম হবে বলে অনেকেই উল্লেখ করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানের সামরিকজান্তা ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ দিবাগত রাত ১২.২০ মি. অর্থাৎ ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু পিপিআরের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রেরিত বার্তায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। ওই সময়েই বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়, শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ।

মুজিবনগর সরকার :

মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল এ সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে।

নামকরণ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বৈদ্যনাথতলা গ্রামের নামকরণ করা হয় ‘মুজিবনগর’। মুজিবনগর সরকারের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়েছিল বলে এ সরকার প্রবাসী মুজিবনগর সরকার হিসেবেও খ্যাত।

সরকার গঠন: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড তথা প্রধান নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একটি সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুক্তাঞ্চল বৈদ্যনাথতলায় সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আবদুল মান্নান এমএনএ এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী এমএনএ। নবগঠিত সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে এখানে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

মন্ত্রীদের দফতর বণ্টন: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সরকার গঠন এবং ১৭ এপ্রিল সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও মন্ত্রীদের মধ্যে দফতর বণ্টন হয় ১৮ এপ্রিল। মুজিবনগর সরকারকে ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ভাগ করা হয়। এছাড়া কয়েকটি বিভাগ মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীন থাকে।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগ:

১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- রাষ্ট্রপতি।২. সৈয়দ নজরুল ইসলাম- উপরাষ্ট্রপতি (রাষ্ট্রপতি পাকিস্তানে অন্তরীণ থাকার কারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত)।৩. তাজউদ্দীন আহমদ- প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা, তথ্য, সম্প্রচার ও যোগাযোগ, অর্থনৈতিক বিষয়াবলি, পরিকল্পনা বিভাগ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শ্রম, সমাজকল্যাণ, সংস্থাপন এবং অন্যান্য যেসব বিষয় কারও ওপর ন্যস্ত হয়নি তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী।৪. খন্দকার মোশতাক আহমদ- মন্ত্রী, পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।৫. এম মনসুর আলী- মন্ত্রী, অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।৬. এ এইচ এম কামরুজ্জামান- মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়।

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরসমূহ

সেক্টর নং ১

ফেনী নদী থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও ফেনী পর্যন্ত ছিল ‘সেক্টর নং ১’। এই সেক্টরের  সদর দপ্তর  ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের  হরিনা। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান এবং জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কমান্ডার ছিলেন মেজর রফিকুল ইসলাম। আর এই সেক্টরকে পাঁচটি সাব সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল।

সেক্টর নং ২

ঢাকা, কুমিল্লা, আখাউড়া–ভৈরব, নোয়াখালী ও ফরিদপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘সেক্টর নং ২’। এই সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের ত্রিপুরার মেঘালয় অঞ্চলে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর কেএম খালেদ মোশাররফ ও সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর এটিএম হায়দার। এই সেক্টরে ৬টি সাব-সেক্টর ছিল।

সেক্টর নং ৩

হবিগঞ্জ, আখাউড়া–ভৈরব রেললাইন থেকে পূর্ব দিকে কুমিল্লা জেলার অংশবিশেষ এবং কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার কিছু অংশ ছিল ‘সেক্টর নং ৩’ এর আওতায়। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কলাগাছিয়ায় এই সেক্টরের সদর দপ্তর অবস্থিত ছিল। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর কেএম শফিউল্লাহ। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন মেজর এএনএম নুরুজ্জামান। আর এই সেক্টরেও ছিল ৬টি সাব-সেক্টর।

সেক্টর নং ৪

সিলেট জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘সেক্টর নং ৪’। এই সেক্টরেও ছিল ৬টি সাব-সেক্টর। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর সিআর (চিত্তরঞ্জন) দত্ত এবং ক্যাপ্টেন এ রব। সদর দপ্তর ছিল প্রথমে করিমগঞ্জ, পরবর্তীতে আসামের মাছিমপুর।

সেক্টর নং ৫

বৃহত্তর ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং সিলেট জেলার অংশ বিশেষ  নিয়ে ‘সেক্টর নং ৫‘ গঠিত হয় । মেজর মীর শওকত আলী ছিলেন সেক্টর কমান্ডার। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকের বাঁশতলায় এই সেক্টরের সদর দপ্তর করা হয়েছিল। এই সেক্টরকেও ৬টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়ছিল।

সেক্টর নং ৬

দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহাকুমা  ও ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অঞ্চল ব্যতীত সমগ্র রংপুর নিয়ে গঠিত হয় ‘সেক্টর নং ৬’। এই সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল বুড়িমারী, পাটগ্রাম। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ইউং কমান্ডার এমকে বাশার। এই সেক্টরে ছিল ৫টি সাব-সেক্টর।

সেক্টর নং ৭

রাজশাহী, পাবনা, ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরবর্তী এলাকা ব্যতীত সমগ্র বগুড়া, দিনাজপুরের দক্ষিণ অঞ্চল ও রংপুরের কিছু অংশ ছিল ‘সেক্টর নং ৭’ এর অন্তর্ভুক্ত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তিনজন যথা: মেজর নাজমুল হক, সুবেদার মেজর এ রব ও মেজর কাজী নুরুজ্জামান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তরঙ্গপুরে ছিল এই সেক্টরের সদর দপ্তর। এই সেক্টরে ছিল ৯টি সাব-সেক্টর।

সেক্টর নং ৮

কুষ্টিয়া, যশোর, দৌলতপুর সাতক্ষীরা সড়ক পর্যন্ত খুলনা জেলা ও ফরিদপুরের কিছু অংশ ছিল ‘সেক্টর নং ৮’ এর অন্তর্ভুক্ত। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ও আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর এম এ মঞ্জুর। এই সেক্টরে ছিল ৭টি সাব-সেক্টর।

সেক্টর নং ৯

পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয় ‘সেক্টর নং ৯’। ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল ও তারপর মেজর জয়নাল আবেদীন এবং এছাড়াও অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন মেজর এম এ মঞ্জুর। এই সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের বসিরহাটের টাকিতে। এই সেক্টরে ছিল ৩টি সাব-সেক্টর।

সেক্টর নং ১০

সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, নৌ কমান্ডো  ও আভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন ছিল ‘সেক্টর নং ১০’ এর অধিনে। এ সেক্টরে নৌ কমান্ডোরা যখন যে সেক্টরে মিশনে নিয়োজিত থাকতেন, তখন সে সেক্টরের কমান্ডারের নির্দেশে কাজ করতেন। এই সেক্টরে কোনো সাব-সেক্টর ছিল না এবং ছিল না নিয়মিত কোনো সেক্টর কমান্ডার। নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়, নৌবাহিনীর আটজন বাঙালি কর্মকর্তা এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সেক্টর নং ১১

কিশোরগঞ্জ বাদে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা নিয়ে গঠিত হয় ‘সেক্টর নং ১১’। এপ্রিল থেকে ৩ই নভেম্বর পর্যন্ত সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম আবু তাহের ও তারপর ফ্লাইট লেফট্যান্যান্ট এম হামিদুল্লাহ। আর এই সেক্টরের সদর দপ্তর  হিসেবে ভারতের আসামের মহেন্দ্রগঞ্জকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। এই সেক্টরকে ৭টি সাব-সেক্টর ভাগ করা হয়েছিল।

(সংগৃহীত)
নিজস্ব প্রতিবেদক, এই সময়

 

খুব দ্রুত ম্যাথ ও মানসিক দক্ষতা নিয়ে আমরা ওয়ার্কশপের আয়োজন করবো, চোখ রাখুন এই গ্রুপে – https://www.facebook.com/groups/720153771883833/?ref=share

আমাদের সাথে আরও যুক্ত থাকুন::
লাইক দিন: https://www.facebook.com/eisomoy365/ (‘এই সময়’ ফেসবুক পেইজ)
সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে: https://youtu.be/ZBMTaqUNbh4

Facebook Comments

Related Articles