অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পাহাড়বেষ্টিত ভূখণ্ড কর্ণফুলী নদীর উত্তাল স্রোত এসে যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে সেই পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আমাদের অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা। কন্যাসন্তান তার ওপরে গায়ের রঙ কালো। সে সময়ে এমনিতেই কন্যাসন্তানের জন্ম খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারত না সব পরিবার। প্রীতিলতার বাবা জগদ্বন্ধু ওয়েদ্দেদার ছিলেন মিউনিসিপাল অফিসের হেড কেরানি।

৫ মে যখন প্রীতিলতার জন্ম হয় তার বাবা খুশি হতে পারেননি। তার ওপর প্রীতিলতার গায়ের রঙ ছিল কালো। মায়ের নাম ছিল প্রতিভা দেবী। পরিবারের ৬ ভাই বোনের মধ্যে প্রীতিলতা ছিল দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকে অন্তর্মুখী, লাজুক ও মুখ চোরা ছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি নম্রতা, বদান্যতা, রক্ষণশীলতা লালন করেছিলেন। প্রীতিলতার ডাকনাম ছিল রানী।

প্রীতিলতার পড়াশোনার হাতেখড়ি মা-বাবার কাছে। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। জগদ্বন্ধু ওয়েদ্দেদার মেয়েকে ড. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পান তিনি। ওই স্কুল থেকে ১৯১৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন প্রীতিলতা। তারপর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। কলেজে পড়া অবস্থায় লীনা নাগের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। লীনা নাগ ওই সময়ে দীপালি সংঘের নেতৃত্বে ছিলেন। শিক্ষা জীবনে প্রীতিলতা সফলতা অর্জন করেন। ১৯৩০ সালে সবার মধ্যে পঞ্চম ও মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। বিএ পাস করে তিনি চট্টগ্রামের নন্দন কানন অর্পনাচরন ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। ইডেন কলেজে পড়ার সময় বিপ্লবী সংগঠন ‘দীপালি সংঘ’ ও বেথুন কলেজে থাকতে ‘ছাত্রী সংঘের সক্রিয় কর্মী হলেও মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি স্কুলের শিক্ষকতায় যোগদানের পর।

প্রীতিলতা যখন চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তখন দেখলেন যে মাস্টারদা সূর্যসেন ও আম্বিকা চক্রবর্তীকে রেলওয়ের টাকা ডাকাতির অপরাধে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে।১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্র লুট, রেললাইন উপড়ে ফেলা, টেলিগ্রাফ-টেলিফোন বিকল করে দেয়াসহ ব্যাপক আক্রমণ হয়। এ আক্রমন চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ নামে পরিচিতি পায়।এ আন্দোলন সারাদেশের ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে।

চাঁদপুরে হামলার ঘটনায় বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির আদেশ হয়। এবং তিনি আলীপুর জেলে বন্দি হন। প্রীতিলতা রামকৃষ্ণের বোন পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতেন। রামকৃষ্ণের প্রেরণায় প্রীতিলতা বিপ্লবী কাজে আরো বেশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৩১ সালে ৪ আগস্ট রামকৃষ্ণের ফাঁসি হওয়ার পর প্রীতিলতা আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। ওই সময়ের আরেক বিপ্লবী কন্যা কল্পনা দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয় প্রীতিলতার। বিপ্লবী কল্পনা দত্তের মাধ্যমে মাস্টারদার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন প্রীতিলতা।

বিশ শতকের শুরু থেকে তিরিশের দশক ছিল ‍বৃটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের অগ্নিযুগ।অনুশীলন, স্বদেশী, খেলাফত, অসহযোগ, কমিউনিস্ট আন্দেোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব, প্রবল আকার ধারণ করে।কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, প্রজা সমিতি প্রভৃতি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। এ সময়ে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মদান করেন, প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যাও নিকটবর্তী সময়ে, ঘটে খ্যাতনামা বিপ্লবী বিনয়, বাদল, দীনেশদের রাইটাস বিল্ডিং এ অলিন্দ যুদ্ধ ও আত্মাহুতি, ১৯৩০ সালে সূর্যসেনের নেতৃত্বে ঘটে ঐতিহাসিক চট্রগ্রামে অস্ত্রগার লুণ্ঠন ।

পূর্ণেন্দু দস্তিদার টেবিলের পাশে বসে রানীর ইতিহাসের বইটি উল্টাচ্ছিলেন। হঠাৎ বইয়ের পৃষ্ঠার মধ্য থেকে একটি ছবি পড়ে গেল। রানী ছবিটি উঠিয়ে দাদাকে দেখিয়ে বলে, “নিশ্চয়ই তুমি এই ছবিটি চেনো? ‘ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই’। এই বই অনেক আগেই পড়ে শেষ করেছি।সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঝাঁসির রানী, রানী ভবানীর মতো আমি দেশের জন্য কাজ করবো, লড়বো। প্রয়োজনে এদের মতো জীবন উৎসর্গ করবো। তোমাদের সাথে যুক্ত হব।তাছাড়া তোমরা আমায় ‘রানী’ বলে ডাক।নাটোরের রানী আর ঝাঁসির রানী যা পেরেছিল, চাটগাঁর রানী নিশ্চয়ই তা পারবে, দাদা?

১৯৩২, ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকের উদ্দেশ্যে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত রওনা হন, কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। মাষ্টারদা সূর্য সেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব প্রীতিলতাকে নিতে বলেন।

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২
ইউরোপিয়ান ক্লাব :
পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি এবং পায়ে রাবার সোলের জুতা।
সাথে ছিলেন – কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী (এদের পরনে ছিল- ধুতি আর শার্ট), মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন (এদের পরনে ছিল- লুঙ্গি আর শার্ট)।রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ছিল শনিবার, তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন।প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ইউরোপিয়ান ক্লাব কেঁপে উঠেছিলো।কয়েক জন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার থাকায় তারা পাল্টা আক্রমণ করে।প্রীতিলতার দেহের বাম পাশে গুলি লাগে।আক্রমণ শেষে পূর্ব সিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড খান।কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশদের নৃসংশ অত্যাচারের ফলে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশটিকে পুলিশ প্রথমে পুরুষ ভেবে ভুল করে। কিন্তু মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চু্লের মেয়েটিকে দেখে শুধু পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকার নড়েচড়ে ওঠে। আলোড়িত আর আন্দোলিত হয় গোটা ভারতবর্ষ আর বাঙালি, দেশভাগের আগের সেই ভারত বর্ষ স্বাধীনতা লাভের সোপানে আরেক পা অগ্রসর হয়, ২১ বছরের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বাঙালি মেয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করে রচনা করে গেলেন ইতিহাস !
প্রমান করে দিলেন নারী আর পুরুষের
মধ্যে ব্যবধান শুধু প্রকৃতিগত,
সাহসিকতায় তারা এক কাতারে ।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর আত্মাহুতি দিবসে
সশ্রদ্ধ লাল সালাম….

লেখাঃ সুনীল ধর।

Facebook Comments

Related Articles