করোনাক্রান্ত ট্রাম্প ও সামনের নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্নোত্তর

প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনের ৩৩ দিন বাকী রয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রাম্পের করোনাক্রান্তের খবর নিজেই ট্যুইটিং করেছেন। এমতাবস্থায় বিশ্বব্যাপী অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। সম্ভাব্য প্রশ্ন এবং উত্তর খোঁজা যাক:

কেমন করে ট্রাম্প করোনাক্রান্ত হলেন?

সঠিকভাবে জানা যায়নি। কিন্তু প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত নিকটতম সহযোগী হপ হিকসের করোনাভাইরাস পজিটিভ আবিষ্কৃত হয় বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকালে। এবং পর পরই ট্রাম্প এবং মেলিনা ট্রাম্পের করোনাভাইরাস টেস্ট করার খবর চাউর হয়ে যায়। হিকস গত মঙ্গলবার ট্রাম্পের সাথে ৯০ মিনিটের ডিবেটে সঙ্গী ছিলেন এবং তারপরে বুধবার রাতেও মিনেসোটায় একটি রেলীতে প্রেসিডেন্টের সাথে ছিলেন।

কখন ট্রাম্পের করোনা টেস্ট পজিটিভ হয়?

স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ১ টায় প্রেসিডেন্ট তাঁর করোনা টেস্ট পজিটিভ হওয়ার বিষয়টি ট্যুইট করেন। তিনি অবশ্য ফক্স নিউজের সিন হ্যানিটিকে জানান হিকস এর পজিটিভ হওয়ার কারনেই তাঁর এবং মেলিনা ট্রাম্পের করোনা টেস্ট করা হয়। এপির (এ্যাসোসিয়েট প্রেস) খবর অনুযায়ী মিনেসোটার রেলী শেষ করে ফেরার পর পরই বুধবার হিকস আইসোলেশনে চলে যান।

ট্রাম্প কতোটা অসুস্থ?

ট্রাম্পের ডাক্তার সিন পি কোনলি’র মতে প্রেসিডেন্ট এবং মেলিনা ট্রাম্প তেমনটা অসুস্থ বোধ করছেননা। ডাক্তারের মতে ট্রাম্প তাঁর প্রসিডেন্সিয়াল কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো সুস্থাবস্থায় রয়েছেন। তবে কোনলি বলেছেন যে প্রেসিডেন্টকে ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারী মেডিকেল সেন্টারে নেয়া হয়েছে যেখানে কয়েক দিন ডাক্তারের পরামর্শে থাকবেন। কোনলি বলেন ট্রাম্প কিছুটা পরিশ্রান্ত তবে তাঁর মনের জোড় রয়েছে। ট্রাম্পকে ন্যাশনাল মিলিটারী মেডিকেল সেন্টারে নেয়ার সময় মাস্ক পরিহিত দেখা গেছে। হোয়াইট হাউজ চীফ অব স্টাফ মার্ক মিডোস ট্রাম্পের কোভিড-১৯ এর মৃদু সিম্পটমের কথা বলেছেন।

৭৪ বছর বয়স্ক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করার সম্ভাবনা কতোটুকুন? এবিসি নিউজের ড: নরম্যান সোয়ানের মতে এই সম্ভাবনা ৫% থেকে ১২%। ট্রাম্পের অবশ্য স্থূলতা রয়েছে। স্থূলতা কোভিড আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ৪০% বাড়িয়ে দেয়। ট্রাম্পের স্থূলতা বিবেচনায় নিলে তাঁর মৃত্যু ঝুঁকি ১৫% থেকে ১৮% হতে পারে। ট্রাম্প বেশ অসুস্থ হতে পারেন। যদিও সেটা কারও প্রত্যাশিত নয়।

আর কে কে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন?

এখনও জানা যায়নি ট্রাম্প কতো সময় ধরে আক্রান্ত হয়ে আছেন। পুরো সপ্তাহব্যাপী তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। কংগ্রেস সদস্যদের নিয়ে ট্রাম্প ওহাইও ভ্রমন করেছেন। বিভিন্ন কংগ্রেস সদস্যদের সাথে আলাদা আলাদা সভায় মিলিত হয়েছেন রোজ গার্ডেনে। ওহাইও তে ৯০ মিনিটের প্রথম বিতর্ক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেছেন জো বাইডেনের সংগে। প্রেসিডেন্টের সাথে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। মিনিপোলিশ স্টেটে এক বাসায় ফান্ডরেইজিং এ অংশগ্রহন করেছেন। তারপর একই স্টেটে একটি আউটডোর রেলিতে অংশগ্রহন করেন। বৃহস্পতিবার যেদিন ট্রাম্পের করোনা টেস্ট পজিটিভ হয় সেদিন তাঁকে বিনা মাস্কে নিউজার্সীতে বেডমিনসটার রিসোর্টে ফান্ডরেইজিং এ অংশগ্রহন করতে দেখা গেছে। হোয়াইট হাউজ অবশ্য নিশ্চিত করেছে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং তাঁর স্ত্রী কেরেনের করোনাভাইরাস টেস্ট নেগেটিভ হয়েছে।
সুতরাং ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের থেকে শুরু করে সকল কংগ্রেস সদস্যগন ট্রাম্পের দ্বারা সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন।

জো বাইডেনের ক্ষেত্রে কি ঘটে থাকতে পারে?

যদিও ৯০ মিনিটের বিতর্ক চলাকালীন জো বাইডেন ট্রাম্পের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারপরও করোনা টেস্ট রেজাল্ট তাঁর ক্ষেত্রে নেগেটিভ হয়েছে। বাইডেনের স্ত্রী জিলের টেস্টও নেগেটিভ হয়েছে। ট্রাম্পের আক্রান্তের নিউজ মিডিয়ায় আসার পর জো এবং তাঁর স্ত্রী জিল, ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডীর দ্রুত রিকভারীর জন্য প্রার্থনা করছেন। জো বাইডেনের পূর্ব পরিকল্পিত ক্যাম্পেইন ইভেন্টগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে।

ট্রাম্প রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম হলে কি ঘটতে পারে?

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে বর্তমান প্রসিডেন্ট কর্মক্ষমতা হারালে, মৃত্যুবরন করলে, পদত্যাগ করলে অথবা অপসারিত হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহন করবেন। যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও অক্ষম হোন তখন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টিটিভস এর স্পিকার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহন করবেন। সেক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ন্যান্সী পেলোসী হবেন প্রসিডেন্ট এবং ২০ জানুয়ারী ২০২১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

৩ নভেম্বর ২০২০ প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন কি পেছানো যাবে?

পরিস্থিতি যা’হোক নির্বাচন পেছানোর ব্যাপারটি অসম্ভব। একমাত্র ইউএস কংগ্রেসের ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন পেছানোর। ইউএস কনস্টিটিউশনের সর্বশেষ এ্যামেন্ডমেন্ট অনুযায়ী কংগ্রেস শুধুমাত্র ২০ জানুয়ারী ২০২১ পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত করতে পারে। ইউএস সংবিধানানুযায়ী ট্রাম্প বা পেন্স বা পেলোসি কেহই কোনো পরিস্থিতিতে ২০ জানুয়ারী ২০২১ এর পর আর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেননা যদিনা পূন:নির্বাচিত হোন।

ট্রাম্প বা জো বাইডেনের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত খারাপ কিছু ঘটলে কি হতে পারে?

রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে নিয়মের সামান্য পার্থক্য থাকলেও ধারণাগত তেমন পার্থক্য নেই। উভয় দলের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নির্ভর করে দলের জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর। কয়েকশ’ সদস্য বিশিষ্ট (পার্টির সিনিয়র চিন্তাবিদগন, সিনিয়র ইলেকটেড মেম্বার, এবং সাবেক প্রসিডেন্টগন) কমিটি মেম্বারগন সিদ্ধান্ত গ্রহন করে থাকেন। এক্ষেত্রে হয়তো প্রার্থী হিসেবে পেন্স রিপ্লেস করতে পারেন ট্রাম্পকে এবং কামালা হ্যারিস রিপ্লেস করতে পারেন জো বাইডেনকে। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীগনই যে রিপ্লেস করবে এমন কোনো বিধি নেই।

বাকী প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেটগুলোর কি হবে?

একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নের জন্ম দিয়েছে। এই ডিবেটগুলো বাতিল হতে পারে; কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়নি এখন পর্যন্ত।
আগামী ৬ দিনের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং ডেমোক্র্যাট ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কামালা হ্যারিসের মধ্যে একটি ডিবেট অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। ইউএস মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী এই ডিবেটটি অনুষ্ঠিত হবে। ট্রাম্প এবং জো বাইডেনের মধ্যে যথাক্রমে শুক্রবার ১৬ অক্টোবর এবং ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠানের কথা ছিলো। ১৬ অক্টাবরের ডিবেটে ফ্লোরিডা স্টেটের নিরপেক্ষ আনডিসাইডেড ভোটারদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার কথা ছিলো উভয় প্রার্থীর। যেসমস্ত জার্নালিস্ট হোয়াইট হাউজ কভার করছেন তাদের মতে ৭৭ বছর বয়স্ক জো বাইডেন কিছুতেই হয়তো ট্রাম্পের সামনা সামনি আর কোনো ডিবেটে অংশ নিতে সম্মত হবেননা।

ইলেকশন ক্যাম্পেইনের কি হবে?

করোনাভাইরাস প্যানডেমিকের কারনে উভয় প্রার্থীর ক্ষেত্রে ইলেকশন ক্যাম্পেইন অলরেডি ব্যাহত হয়েছে। ট্রেডিশনাল সরাসরি ক্যাম্পেইনের পরিবর্তে ভার্চ্যুয়াল ক্যামপেইন করতে হয়েছে। জো বাইডেনের বাকী সময়ের ক্যাম্পেইন স্ট্রাটেজী হচ্ছে যেসব স্টেটে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থা ভালো নয় সেসব স্টেটে সরাসরি ক্যাম্পেইন করা।
অপর পক্ষে ট্রাম্পের আগামী সপ্তাহে অন্তত চারটি রেলীর শিডিউল ছিলো। এই শিডিউলগুলো অবশ্যই বাতিল হবে। এমনকি ট্রাম্প আদৌ ৩ নভেম্বর ২০২০ নির্বাচনের পূর্বে হয়তো কোনো রেলী করতে সমর্থ্য না-ও হতে পারেন।

ভোটারদের মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন আসতে পারে?

ইলেকশন দিনের কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত না দেখা পর্যন্ত আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা তা’ এখনই বলা যাবেনা। জরীপকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে ট্রাম্পের করোনাক্রান্ত হওয়ার নিউজ প্রকাশিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খুব কম সংখ্যক ভোটার আনডিসাইডেড ছিলেন। অর্থাৎ তারা কাকে ভোট দিবেন সেই মর্মে সিদ্ধান্তে ছিলেন। এবিসি’র চীফ ফরেন করেসপন্ডেন্ট ফিল উইলিয়ামের মতে ট্রাম্পের করেনাক্রান্তের নিউজ আনডিসাইডেড ভোটারদের জো বাইডেনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। জো বাইডেন এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্টেটগুলোতে ক্যাম্পেইনের ফলে একক সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে আইসোলেশনে থেকে হতাশাগ্রস্ত হবেন।

লেখাঃ এমডি শফিকুল আলম ।

Facebook Comments

Related Articles