জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব ও আমাদের করণীয়

চরম উষ্ণ তাপমাত্রায় পৃথিবী। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে পৃথিবীর অনেকগুলো দ্বীপ রাষ্ট্র ডুবে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বনাঞ্চল পুরে ছারখার হয়ে গেছে। প্রাণিকুলের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোনো ফসলের মাঠ নেই,বিশুদ্ধ পানি নেই,নিঃশ্বাস নেওয়া জন্য অক্সিজেন নেই।চারদিকে শুধু নেই আর নেই এর হাহাকার। আছে শুধু বাতাসে বিষাক্ত কার্বন কণা।যে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হয় তাতেও রয়েছে বিষাক্ত  সালফিউরিক এসিডের মিশ্রণ। এমনটাও কি সম্ভব? হ্যাঁ সম্ভব!!! এবং ঘটতে যাচ্ছে,যদি না জলবায়ু পরিবর্তনক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। আমি বলতেছি মহাবিশ্বের একমাত্র বসবাসযোগ্য গ্রহ পৃথিবীর কথা, তার জলবায়ু পরিবর্তনের কথা এবং তার অন্ধকার ভবিষ্যতের কথা। একবিংশ শতাব্দীর সবথেকে চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করা। পুরো বিশ্ব কিছুটা হলেও সে পথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু হঠাৎ করোনা নামক মহামারী সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। সারা বিশ্বের মানুষ এখনও করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে এ করোনা যেন মরার ওপর খঁড়ার ঘা। পরিবেশের ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে আমাদের ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবীটাকে বিপজ্জনক করে তুলেছি।বিবর্তন মানুষের মনের লোভ ও সহিংসতা জাগিয়ে তুলছে। মানব সংঘাত কমার কোনো লক্ষণ নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির বিকাশ এবং মারাত্মক অস্ত্রগুলো মানব সভ্যতা ও পরিবেশের  জন্য ধ্বংসাত্মক। যেখানে মানবসভ্যতা টিকেই আছে প্রাণিকুল আর উদ্ভিদকুলের উপর নির্ভর করে। আর আমরা সেই আমাদের নির্ভরতা প্রতীককেই ধ্বংস পথে নিয়ে যাচ্ছি। একটা সময় আসবে যখন অনেক অর্থ থাকবে কিন্তু খাবার থাকবে না। তখন মানুষ বুঝবে টাকা খাওয়া যায় না 
মানুষ প্রকৃতির ছোট্ট একটি অংশ। অথচ মানুষ যে হারে প্রকৃতিকে করায়ত্ত করার (বৃথা) চেষ্টা করেছে তা অচিন্তনীয়। করোনা ভাইরাসকে অনেকে বলছেন “প্রকৃতির সমুচিত জবাব,” যার জন্য মানুষই দায়ী। কারণ, মানুষ প্রকৃতি ও প্রাণীজগতকে শোষণ করছে। করোনা ভাইরাসের টিকা আজ না হয় কাল আসবেই, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন রক্ষার্থে কোন টিকা নেই। তাই জলবায়ু নিয়ে আমাদেরকে ভাবতেই হবে, বিশেষকরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য।জলবায়ুর পরিবর্তন আজ এক স্বীকৃত সত্য, বাস্তব ঘটনা৷ তাপমাত্রা বাড়ছে৷ ঘটছে পৃথিবী নামের গ্রহটির উষ্ণায়ন৷ উষ্ণতা বাড়ার কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার বাড়বে বলেও আশংকা৷
 জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৭০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৩০০ কোটি মানুষকে ‘প্রায় বসবাস–অযোগ্য’ চরম উষ্ণ তাপমাত্রার মধ্যে থাকতে হবে। যদি গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো না যায়, তাহলে পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষকে গড়ে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়েও বেশি তাপমাত্রায় বসবাস করতে হবে। নতুন এক সমীক্ষার ফলাফলে এ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা।যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল সিস্টেমস ইনস্টিটিউট এর তথ্য মতে,শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে  ২০১৯ সালে সারা পৃথিবীতে ক্ষতিসাধন হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। 
জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের (আইপিসিসি) এর ষষ্ঠ  প্রতিবেদন অনুযায়ী, একুশ শতকের শেষভাগ নাগাদ ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার কিংবা ২ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং সামনের শতাব্দীগুলোতে আরও কয়েক মিটার বাড়ার অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। এ রকম অবস্থায় কিছু দ্বীপরাষ্ট্র পুরোপুরি ডুবে যাবে। যেমন মালদ্বীপ ও টুভ্যালু এবং অসংখ্য দেশ যেমন ইকুয়েডর, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও উত্তরাঞ্চলের অনেকাংশ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হবে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জীবন ও জীবিকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আসন্ন বিপদের অন্যতম ভুক্তভোগী বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ও খরাপ্রবণ দেশ। ২০১৭ সালের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিসূচক অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সারা বিশ্বে ষষ্ঠ। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩২০ কোটি ডলার বা ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ২ শতাংশ।সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় এক-দশমাংশ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হবে। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে এবং জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার কারণে পানির চাহিদা বাড়ার ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেবে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে। কারণ বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অসময়ে বৃষ্টিপাত, ঘন কুয়াশার কারণে কৃষি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে।এ দেশের জনসংখ্যার বড় একটা অংশ উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে  উপকূলীয় এলাকায় বাস্তুসংস্থান ও ভারসাম্য নষ্ট হবে। মাটির গুণগত অবনতি ঘটবে। দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার বৈচিত্র্য এবং খরা দেখা দেবে। সিডর, আইলা, রেশমি, আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে জমি লবণাক্ত হবে, ফসল নষ্ট হবে, ভাঙন ও ভূমিধসে জমির পরিমাণ কমবে।উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের জমাট বরফ দ্রুত গলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে, ভূমিধস বাড়বে, দীর্ঘ মেয়াদে নদীগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাবে। আর্দ্রতা পরিবর্তনের কারণে কীটপতঙ্গ, রোগব্যাধি ও নানাবিধ সমস্যা  বাড়বে। 
এই পর্যবেক্ষণ থেকে আন্দাজ করা যায়, আমাদের ওপর কতটা জোরাল হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব।
এই ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন বিশ্ববাসীর সম্মিলিত প্রয়াস। কিন্তু সমস্যাটি এখানেই। যাদের এই সঙ্কট নিরসনে মুখ্য ভূমিকা পালন করার কথা, এবং যেসব দেশ এই সমস্যা সৃষ্টিতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখে চলেছে; তারাই এ নিয়ে জারি রেখেছে এক নোংরা রাজনীতি। আর এই নোংরা রাজনীতি এ সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করে তুলছে। এরা যেমন নানা ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে, তেমনিভাবে নতুন কোনো চুক্তি সই করতেও অনীহ। আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন রোধে কোনো প্রয়াসেও এদের পাওয়া যাচ্ছে না। এরাই এ সঙ্কট সমাধানে সম্মিলিত প্রয়াসের সব পথ বন্ধ করে রেখেছে।আমাদের জানা দরকার, কী কারণে সময়ের সাথে পৃথিবীর উষ্ণতার এই বেড়ে চলা। বলা হয়, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের তথা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পেছনে ৩৬-৭০ শতাংশ দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রভাব, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উদগিরণ দায়ী ৯-২৬ শতাংশ, মিথেন গ্যাস দায়ী ৪-৯ শতাংশ এবং ওজোন দায়ী ৩-৭ শতাংশ। বাষ্পীভূত পানি, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড ও সালফারের অন্যান্য অক্সাইডগুলো, নাইট্রাস-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, মিথেন এবং ওজোন ইত্যাদি হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পাওয়া প্রাথমিক গ্রিন হাউজ গ্যাস।যদি এই গ্যাস নিঃসরন অনেক কমাতে পারি তাহলে কিছুটা হলেও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। 
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হলে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস লাগবেই লাগবে।জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় মানুষকে সজাগ ও সচেতন করতে হবে।কলকারখানায় কালো ধোঁয়া নির্গমন কমিয়ে আনতে হবে। কার্বন নির্গমন শূন্যের কোঠায় আনতে হবে।সিএফসি নির্গত হয় এমন যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমাতে হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে বনভূমি ধ্বংস বন্ধ করতে হবে এবং বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন বাড়াতে  হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। সবুজ অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে।সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধান করতে হবে। প্রকৃতির ওপর মানুষের বিরূপ আচরন বন্ধ করতে হবে। প্যারিস বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে,সুস্থ পৃথিবীর জন্য,জলবায়ু পরিবর্তন এখনই রুখে দিতে হবে। 

হুমায়ুন মাহমুদ ইলিয়াস,শিক্ষার্থী, উপকূলীয় বিদ্যা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় 

Facebook Comments

Related Articles