বিসিএস-এর জন্য জেনে রাখুনঃ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পদ্ধতি ও ইতিহাস

মাস পেরোলেই বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সংবিধান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর অন্তত নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী দেশটির আগামী চার বছর কে নেতৃত্ব দেবে সেটা নিয়ে আমেরিকানদের যেমন চিন্তার শেষ নেই তেমনি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সরকার ও জনগণের কাছেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু আমেরিকার এই নির্বাচন পদ্ধতি অন্যান্য দেশের নির্বাচন পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এবং অনেকাংশে জটিল।সুতরাং আমেরিকার এবারের ৫৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে সেদেশের নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচনের ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান পার্টি থেকে নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে জো বাইডেন।
প্রথমে আমরা দেখে নেব যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে হলে কী যোগ্যতা প্রয়োজন-

★প্রেসিডেন্টের যোগ্যতা:
সংবিধান অনুযায়ী –
১. রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে।
২. তাকে জন্মসূত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে।
৩. তাকে কমপক্ষে ১৪ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে হবে। মার্কিন নাগরিক অধিকার প্রাপ্ত কোন বিদেশি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে পারেন না।

★প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া:

নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবাবের পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার নির্বাচক সংস্থার প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করেন।এরপর ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় বুধবারের পরের সোমবার নির্বাচক সংস্থার সদস্যরা নিজ নিজ জেলায় উপস্থিত থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন।ভোট শেষে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যের (৫০টি) ভোট বাক্স সীল করে রাজধানী ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়।
পরের বছর ৬ জানুয়ারি সিনেটের উভয় কক্ষের সদস্যকে সামনে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ করা হয়।প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে যিনি মোট ৫৩৮টি ইলেকট্রোরাল ভোটের মধ্যে কমপক্ষে ২৭০টি লাভ করেন তিনি পরবর্তী চার বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। ভোটের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে ‘ন্যাশনাল আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।’

এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার কিছু বিবেচ্য বিষয়:
-প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট একই অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত হতে পারে না।
-জনপ্রতিনিধি কক্ষ যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে তখন অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অঙ্গরাজ্যের অংশগ্রহণ আবশ্যিক বলে বিবেচিত হয়।
-প্রতিনিধিগণ সম্মিলিতভাবে একটি মাত্র ভোট দিতে পারেন।
-নির্দিষ্ট কার্যকাল শেষ হওয়ার পূর্বেই প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত হন।যেমন- কেনেডি নিহত হবার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জনসন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

★দ্বি-দলীয় পদ্ধতি :

আমেরিকায় বহু ছোটখাটো রাজনৈতিক দল থাকলেও ফেডারেল ও ফেডারেল বিরোধীদের বিভক্তির ফলে আমেরিকায় দ্বি-দলীয় রাজনীতির গোড়াপত্তন হয়।সাধারণত অধিকাংশ নাগরিকই ছোট দলকে ভোট দিতে আগ্রহী হয় না।তারা মনে করে ছোট দলগুলোকে ভোট দেওয়া বৃথা ও যুক্তিহীন। যার ফলে বৃহৎ দুই দল ডেমোক্রেটিক পার্টি(নির্বাচনী প্রতিক- গাধা) এবং রিপাবলিকান পার্টি(নির্বাচনী প্রতিক- হাতি) প্রাধান্য বিস্তার করে।

★কারা ভোট দিতে পারেন না :

১. একজন বিদেশি অথবা নাগরিক নন এমন ব্যক্তি ভোট দিতে পারেন না।
২. ভোট দানের যোগ্যতা অর্জনের জন্য একজন নাগরিককে কোন রাজ্যের নির্বাচনী এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (সাধারণত ৩০ দিন) বসবাস করতে হবে। এ নিয়মের ফলে অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনা।
৩.অনিবন্ধিত কোন ভোটার ভোট দিতে পারেন না।
৪. শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ভোট দিতে পারেন না।
৫. জেলে বন্দী অবস্থায় কোন ব্যক্তি ভোট দিতে পারেন না।

★প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন পদ্ধতি :

সাধারণত দুইটি ধাপে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়।
১. মনোনয়ন ধাপ: যাতে প্রতিটি দল থেকে আগ্রহী প্রার্থীরা প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আবেদন জানায় এবং জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে অনুমোদন লাভ করে।

২. সাধারণ নির্বাচনী ধাপ: যাতে দুই বা অধিক প্রতিদ্বন্দ্বী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হয়।

★প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পদ্ধতি :

মার্কিন নির্বাচন পদ্ধতি আমাদের দেশের নির্বাচন পদ্ধতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। আমাদের দেশের জনগণ যেমন প্রথমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে এবং এরপর নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের জনগণ প্রথমে আমাদের দেশের সংসদ সদস্যদের মতোই নির্বাচক বা ইলেক্ট্রোরাল নির্বাচিত করে তারপর নির্বাচক মণ্ডলী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন।
নিম্নে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:

★ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দুইটি পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
১. ইলেক্ট্রোরাল কলেজ নির্বাচন ;
২. প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

★প্রাইমারি ও ককাস কী:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীর দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির প্রাথমিক ধাপ হলো প্রাইমারি ও ককাস নির্বাচন।কিছু রাজ্যে প্রাইমারি আবার কিছু রাজ্যে ককাস নির্বাচন হয়।আবার কোন কোন রাজ্যে দুটোই হয়ে থাকে।এ প্রক্রিয়া নির্বাচন বছরে জানুয়ারির শেষ বা ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে শুরু হয়ে মধ্য জুন পর্যন্ত চলমান থাকে। এরপর দলীয় সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্ত প্রার্থীর মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়।

★প্রাইমারি নির্বাচন:
প্রাইমারি নির্বাচন পরিচালনা করে অঙ্গরাজ্য এবং অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় প্রশাসন।এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ নির্বাচনের মতোই একজন প্রার্থী বিজয়ী হন।যুক্তরাষ্ট্রে ৩৪টি রাজ্যে প্রাইমারি নির্বাচন হয়ে থাকে।
মোট চার ধরনের প্রাইমারি নির্বাচন হয়ে থাকে–

১. Closed Primary:
এই ব্যবস্থায় দলের শুধু নিবন্ধিত ভোটার ভোট দিয়ে দলীয় প্রার্থীকে মনোনীত করেন।

২. Semi Closed Primary :
দলের নিবন্ধিত ভোটার এবং সমর্থকরা ভোট দান করে থাকেন।

৩. Open Primary :
প্রার্থী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় যে কোন দলের নিবন্ধিত ভোটার যে কোন দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।

৪. Semi-Open Primary :
এই প্রক্রিয়ায় যে কোন দলের নিবন্ধিত ভোটাররা যে কোন প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।
তবে শর্ত হলো,যখন ভোটাররা ভোট দেন তখন নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে তাদের দলীয় পরিচয় জানাতে হয়।ভোট দেওয়ার জন্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ করে নির্দিষ্ট দলের ব্যালট নিতে হয়।

★ককাস:
ককাস হলো এমন এক নির্বাচনী প্রক্রিয়া যা রাজনৈতিক দল কর্তৃক পরিচালনা করা হয়।বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক দলগুলো ককাসের আয়োজন করে থাকে।রাজ্য প্রশাসন যেহেতু ককাস আয়োজন করেনা তাই দলগুলো ককাস আয়োজনে তাদের নিয়মনীতির ব্যাপারে স্বাধীন থাকে।

★সুপার টিউসডে:
ককাস এবং প্রাইমারি নির্বাচন যেদিন অনুষ্ঠিত হয় সেই দিনটাকে সুপার টুয়েসডে বলা হয়। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা এখান থেকে তাদের প্রতিনিধি সংগ্রহ করে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন।

★প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলেক্ট্রোরাল ভোট:

আমেরিকার জনগণ যখন ভোট দিতে যায় তখন তাদের অনেকেই মনে করেন তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে ভোট দিচ্ছেন।অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ইলেক্ট্রোরাল কলেজের অস্তিত্ব থাকার কারণে বিষয়টি কার্যত তা হচ্ছে না।

ইলেক্ট্রোরাল কলেজ হলো একটি নির্বাচক মণ্ডলীর নাম,যার সদস্যরা রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক কর্মী ও দলীয় সদস্য কর্তৃক মনোনীত হন।নির্বাচনের দিন এই নির্বাচকরা কোন না কোন প্রার্থীর পক্ষে তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেন এখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন।প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের পর ডিসেম্বরে নির্বাচকমণ্ডলীরা নিজ নিজ রাজ্যে গিয়ে নিজেদের ভোট প্রদান করেন এবং প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন।
নির্বাচিত হওয়ার জন্য একজন প্রেসিডেন্টকে নির্বাচকমণ্ডলীর কমপক্ষে ২৭০ টি ভোট পেতে হয় ৫৩৮টি ভোটের মধ্যে। নির্বাচন সংস্থার সদস্য সংখ্যা মার্কিন আইন সভা কংগ্রেসের (সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ) সমান।
অর্থাৎ বর্তমান নির্বাচনী সংস্থার সদস্য সংখ্যা (১০০+৪৩৫+৩) ৫৩৮ জন।১০০ টি সিনেট সদস্য, ৪৩৫ টি প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ সদস্য, ৩টি ওয়াশিংটন ডিসির সদস্য। এই ৫৩৮টি ইলেক্ট্রোরাল ভোট ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে নির্বাচকরা তাদের রাজ্যে জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কখনো ভোট দেয়নি।জনগণের ভোটে যিনি৷ জয়ী হন, তার পক্ষেই যায় ইলেক্ট্রোরাল কলেজের ভোট। ইলেক্ট্রোরাল কলেজের৷ ভোট বিজয়ী প্রার্থীর সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে দৃশ্যত বাড়িয়ে দেয় এবং ভোটে জনগণের নেওয়া সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেয়।

★বর্তমানে ইলেক্ট্রোরাল কলেজ কিভাবে কাজ করে :

১. যে প্রার্থী রাজ্যে জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত হন তিনিই সাধারণত রাজ্যের সব নির্বাচকের ভোট পেয়ে থাকেন।কার্যত, বিজয়ী প্রার্থীর প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী নির্বাচকরাই নির্বাচিত হন।

২. একটি রাজ্যের সিনেটর ও প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের সমান সংখ্যক নির্বাচক থাকেন।কংগ্রেসে ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও নির্বাচকমণ্ডলীতে তিনটি ভোট রয়েছে।

৩. প্রেসিডেন্ট পদে কোন প্রার্থী যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ইলেক্ট্রোরাল ভোট না পায়, তাহলে সিনেট পরিষদকে ইলেক্ট্রোরাল কলেজে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত দুজন প্রার্থীর মধ্যে থেকে একজনকে বিজয়ী হিসেবে বেছে নিতে হবে।

৪. ৬ জানুয়ারি ফলাফল ঘোষণার পর ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট শপথ এবং দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

★বিতর্ক অনুষ্ঠান :

ডেমোক্রেটিক এবং রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনীত দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মোট তিন বার বিতর্ক অংশগ্রহণ করেন।বিতর্কের মাধ্যমে উভয় প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ ভাবনা, পরিকল্পনা, তুলে ধরেন।এই বিতর্ক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রার্থীর কথা শুনে জনগণ তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন বিশেষ করে নতুন ভোটাররা।বিতর্কে কখনো কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং কড়া ভাষায় প্রার্থীগণ একে অপরকে আক্রমণ করে থাকেন।বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে অনেক বার ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন।সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় দ্বিতীয় বিতর্ক অনুষ্ঠান জো বাইডেন ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে অংশগ্রহণ করতে চাইলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজি হননি।যার ফলে এটি বাতিল হয়ে গিয়েছে। তৃতীয় বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে কিনা এখনো নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে দুই ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে একবার বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

★ইলেক্ট্রোরাল ভোট যে পাঁচটি রাজ্যে সর্বাধিক:
১.ক্যালিফোর্নিয়া
২.টেক্সাস
৩.নিউইয়র্ক
৪.ফ্লোরিডা
৫.ইলিনয় এবং পেনসিলভানিয়া

*প্রতিটি রাজ্যে ইলেক্ট্রোরাল ভোট কত হবে সেটা নির্ধারিত হয়ে থাকে সেখানকার মোট জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করে।
★মধ্যবর্তী নির্বাচন:

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি সাধারণ নির্বাচন।প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে একে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলে।প্রতি দুই বছর পর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কংগ্রেসের দুটি কক্ষের মধ্যে নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সকল ও উচ্চ-কক্ষ সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।এছাড়া স্টেট গভর্নর পদেও এ সময় নির্বাচন হয়।এই নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে বিরোধী দল৷ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধী দলের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিতে হয়।

★আমেরিকার নির্বাচনী ইতিহাস:

১. জর্জ ওয়াশিংটন দুই মেয়াদে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি কোন দলের ছিলেন না।

২. ১৯৫১ সালের মার্কিন সংবিধানের ২২তম সংশোধনীর অনুসারে দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।

৩.কোন প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একবার হেরে গেলে আর কখনো এই পদে প্রার্থী হতে পারেন না।

৪.সর্বাধিকবার ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে (২১ বার)।রিপাবলিকান থেকে ১৮ বার।

৫.ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট মোট চার মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন(সর্বাধিক)।

৬.আব্রাহাম লিংকন দুই দফায় দুই দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন(রিপাবলিক এবং ন্যাশনাল ইউনিয়ন)।

৭.রিচার্ড নিক্সন দুই মেয়াদে নির্বাচিত হলেও তিনি ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জেরে পদত্যাগ করেন।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

৮.একমাত্র অনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন জেরাল্ড ফোর্ড।

৯.মোট জনসংখ্যার মাত্র এক-চতুর্থাংশ ভোট কেন্দ্রে যায় ভোট দিতে!

১০.যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলেন হিলারি ক্লিন্টনক।মোট ভোট সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও ইলেক্ট্রোরাল ভোটে পিছিয়ে থাকায় তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি।

১১.বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হয়।কোটি কোটি ডলার খরচ করার জন্য প্রার্থীরা নির্বাচনী তহবিল গড়ে তোলেন।

১২. যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারণা প্রায় ১৮ মাস চলে যেটা পৃথিবীর অন্য দেশের থেকে অনেক বেশি সময় ধরে চলা নির্বাচনী প্রচারণা।

১৩. যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক এবং ধনী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

১৪. রিপাবলিকান পার্টির অন্য একটি নামেও ডাকা হয়।সেটা হলো ‘জিওপি’। অর্থাৎ গ্রান্ড ওল্ড পার্টি।

১৫. জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জয়লাভ করে।কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বেশিরভাগই রিপাবলিকানদের ভোট দেয় কিন্তু তারা কোন জরিপে অংশ নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকেন না।অনেক সময় জরিপ সম্পর্কে জানেনও না।

১৬. নির্বাচনের দিন অধিকাংশ ভোটার ভোট দিলেও আমেরিকায় ডাকযোগে ভোট দেওয়ার প্রচলন আছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রায় ২১ শতাংশ মানুষ ডাকে ভোট দিয়েছিল।করোনা মহামারীর কারণে এবার এই সংখ্যা অনেক বাড়তে পারে।।

★নির্বাচনী প্রতিক ‘গাধা’ ও ‘হাতি’ হবার কারণ :

আমেরিকার সপ্তম প্রেসিডেন্ট এণ্ড্রু জ্যাকসনকে নির্বাচনের প্রচারণার সময় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে ‘জ্যাকঅ্যাস’ বা ‘জ্যাকগাধা’ বলে ডাকত।এটা অবমাননাকর হলেও জ্যাকসন দেখলেন এটা মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিচিত পেয়েছে এবং এটাকে কাজে লাগিয়ে তিনি জয়লাভ করতে চান।তখন থেকে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক গাধা।

রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রতিক ‘হাতি’ হবার কারণ হলো–
ন্যাস্ট ১৮৭৪ সালে ‘হার্পারস উইকলি’তে রিপাবলিকানদের শাসনের সমালোচনা করে একটি কার্টুন আঁকেন। এতে তিনি দেখান,একটি গাধাকে সিংহের চামড়ার পোশাক পরিয়ে একটি চিড়িয়াখানার মধ্যে রাখলে অন্য সব প্রাণী ভয়ে পালালেও হাতি পালায় না।
এর পর থেকেই হাতিকে তাদের প্রতিক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

★শেষ কথা:

অর্থনীতি ও সামরিক দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র।বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে মার্কিন সরকার সারাবিশ্বে তাদের সামরিক ঘাঁটি রেখে দিয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশের শিরায় শিরায় আমেরিকা সরকার বাসা বেধে আছে। যুদ্ধ, আন্দোলন লাগিয়ে দিয়ে একদিকে অস্ত্র বিক্রি বাড়িয়ে দিচ্ছে আবার চুরাই পথে তেলের ট্যাংকার নিজ আয়ত্তে নিয়ে যাচ্ছে। এশিয়ায় খবরদারি করার জন্য চীনের সাথে টক্কর দিচ্ছে আর ইউরোপ তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ন্যাটোর মাধ্যমে আমেরিকাকে তাদের ঘরের কুটুম বানিয়ে রেখেছে। এতোগুলা দিকে মাত্র দুই চোখ দিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখে প্রয়োজনে বুলেটের বৃষ্টি যিনি নামান তিনি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সুতরাং তাকে অবশ্যই যোগ্য হতে হবে। কঠিন নির্বাচন পদ্ধতি পার করে এসে নাগরিকের ভোটে চার বছরের জন্য যিনি হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করবেন তিনি তো আর যায় হোক উম্মাদ নন।যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গত নির্বাচনে কেউ কেউ উম্মাদ বলেছিলেন। যদি সবকিছু ঠিক থাকে তাহলে ২০২১ সালের ২১ জানুয়ারি আবার ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেবেন।আর যদি আমেরিকার জনগণ নিজেদেরকে সুশৃঙ্খল জাতি মনে করে তাহলে বাইডেন এগিয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সংগঠন ও পররাষ্ট্রনীতি–শাহ্ মোঃ আব্দুল হাই।
এবং উইকিপিডিয়া।

★লেখক: মোস্তফা জামান

Facebook Comments

Related Articles