‘হিউম্যান রাইটস’ শেখানো জাবি অধ্যাপিকার যে বর্বর আচরণ আলোচনায়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা স্বপ্না। যিনি সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সভাপতি যিনি “হিউম্যান রাইট’স ইন বাংলাদেশ” কোর্সটি পড়ান !
ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ২৭০ কি:মি: পথ। যাত্রাপথের প্রায় ৮ ঘন্টা বাসার কাজের মেয়েটিকে সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন তিনি। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মঞ্জুরুল ইসলাম পান্নাও ছিলেন সেই বাসের যাত্রী। তার ক্যামেরাইতেই উঠে আসে এই নির্মম দৃশ্য ও ঘটনার বিবরণ৷ খোদ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সারাদেশের মানুষ আজ ধিক্কার জানাচ্ছেন ওই শিক্ষককে যিনি মানুষ গড়ার কারিগরি করেন কিন্তু নিজেই হয়ত মানুষ হয়ে উঠতে পারেন নি। হয়ত টেলিভিশন টকশোতে তিনিই এর আগে শিশুশ্রম ও গৃহকর্মী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলে বাহবা পেয়েছিলেন অথবা কিছু লিখে এনজিও-র টাকা পকেটে পুরেছিলেন।

মঞ্জুরুল ইসলাম পান্না গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে লিখেন, “খুলনা যাচ্ছি। বাসের মধ‍্যে একটি বিষয় লক্ষ‍্য করে পুরো শরীর কাঁপছে। একই বাসে নিজের দুই সন্তানকে নিয়ে সিটের ওপর পা তুলে বেশ আরামে যাচ্ছেন এই মহিলা। ছেলে দুটো চিপস-পপকর্ণ খেয়ে যাচ্ছে পা দুলিয়ে দুলিয়ে। আর ৭/৮ বছরের এই কাজের মেয়েটিকে দাঁড় করিয়েই নিয়ে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার পথ। ভেবে পাচ্ছি না এটা কীভাবে সম্ভব? একটা টিকিটের দাম কত? খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলাম, ছবির এই মহিলা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ‍্যাপক। নিজের পরিবার বা শিক্ষার্থীদের কী শিক্ষা দিচ্ছেন এরা? নিজের সন্তানকে শেখাচ্ছেন- কাজের এই শিশু মেয়েটি কোন মানুষ নয়, এরা একেকটি প্রাণী। এখন নিজে ধর্ষণ করছে, পরবর্তীতে তার সন্তান ধর্ষণ করবে মেয়েটিকে। ইচ্ছে করছে……!!”

ঘটনাটি এরপর ভাইরাল হলে অন্যদের আগ্রহের প্রেক্ষিতে আজ তিনি আরেক পোস্টে জানান, “ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় তিনশো কিলোমিটার পথ কাজের শিশু মেয়েটিকে দাঁড় করিয়ে আনা ওই মহিলার নাম অধ‍্যাপক নাসরিন সুলতানা। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ‍্যাপক। সামন্তবাদী চরিত্রের ওই মহিলা তার দুই সন্তানকে নিয়ে মঙ্গলবার সেন্টমার্টিন পরিবহনে সিটের ওপর পা তুলে ৮ টি ঘন্টা পার করলেও কাজের মেয়েটিকে ওভাবেই আসতে হল। ভেবে পাচ্ছিলাম না কীভাবে কুৎসিত এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করা যায়। বিষয়টি ফেসবুকে তুলে ধরলে বন্ধুবর পুলিশ কর্মকর্তা Shymal Mukherjee নিজেই পরামর্শ দিলেন ৯৯৯-এ ফোন দিতে। সেখান থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হলেও তারা পুলিশের যশোর কন্ট্রোল রুমে জানাতে বলেন। কন্ট্রোল রুমের নাম্বারও তারা এসএমএস করল। কন্ট্রোল রুমে ফোন দিলে যে এসআই ফোন ধরলেন তাঁকে খুব অসহ‍্য মনে হচ্ছিল। আমার অভিযোগ শুনে তিনি যেভাবে কথা বলছিলেন তাতে মনে হল এটা কোন বিষয়ই নয়।
প্রথমে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, কোন সীট খালি থাকলে মেয়েটাকে বসিয়ে দেন। বললাম- সেটাতো আমরা নিজেরাই পারি। এর জন‍্য আপনাকে ফোন দেব কেন। বাসের মধ‍্যে যা ঘটছে, তাতো প্রকাশ‍্যে শিশু নির্যাতন। আপনাদেরতো উচিত আইনের প্রয়োগ ঘটানো।
-এখানে পুলিশ কী করবে? আচ্ছা, সুপারভাইজারকে দেন। আমি বলে দিচ্ছি।
-আপনি কি ঘটনাটার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন?
-ওইতো বুঝছি। কাজের মেয়েকে বসতে দেয়নি। তা, আপনারা সবাই মিলে প্রতিবাদ করেন না….
আমার যেটুকু বোঝার বুঝে ফোন কেটে দিলাম। আবার ফোন দেই ৯৯৯-এ। এবার অন‍্য কেউ ফোন ধরলে তিনিও বিষয়টিতে সমান গুরুত্ব দিয়ে যশোর কন্ট্রোল রুমের ফোন নাম্বার দিতে চাইলেন, কারণ আমাদের গাড়িটির পরবর্তী স্টেশন যশোর। বললাম, ভাই ওখানে কথা বলে কোন লাভ নেই। সব শুনে তিনি অন‍্য একজনের সঙ্গে পরামর্শ করে এবার দিলেন একটি জাতীয় নাম্বার ৩৩৩, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক বিশেষ অভিযোগ জানানো যায়। গাড়ি ততোক্ষণে যশোরের কাছাকাছি। ওই নাম্বারে ফোন দিতে দিতেই সুপারভাইজারের কাছে জানতে পারলাম ওই অধ‍্যাপক মহিলা যশোর নিউমার্কেট এলাকাতেই নামবে। আইনগতভাবে কিছু করার সুযোগ না পেয়ে নিজেই গেলাম ওই মহিলার কাছে।
Excuse me. একটু কথা বলতে পারি?
-হ‍্যাঁ, হ‍্যাঁ। বলুন।
-আপনি কি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন।
খুব মিষ্টি করে বললেন, জ্বী।
-কোন বিভাগে?
-সরকার ও রাজনীতি বিভাগে।
-ও আচ্ছা। কিন্তু ৭/৮ বছরের একটা বাচ্চা মেয়েকে যে এতোটা পথ দাঁড় করিয়ে আনলেন, এটা কি ঠিক হয়েছে? ওর জন‍্য কি একটা আলাদা সিটের ব‍্যবস্থা করা গেল না?
একটু থতমত হয়ে তিনি বললেন, আপনি আসলে ভুল বুঝছেন। ওর আসলে করোনা সিম্পটম আছে। তাই ওকে অন‍্য কোথাও দিতে চাইনি।
-বাহ্!! করোনার লক্ষণ আছে, তাই আলাদা সিট দিলেন না, এটা কোন যুক্তি হল? ওর অসুস্থতার জন‍্যতো তাহলে ডাবল সিটেরই ব‍্যবস্থা করা দরকার ছিল। তা না করে মাত্র কটা টাকার জন‍্য শতশত কিলোমিটার পথ এভাবে দাঁড় করিয়ে আনলেন? এটা কি পুরোপুরি একটা অমানবিক কাজ নয়? আপনিতো রীতিমতো শিশু নির্যাতন করছেন। শিক্ষিত ভদ্রমানুষের লেবাস ধরে এ ধরণের মানসিতায় লজ্জা হয় না আপনার? ছিঃ….
তিনি বললেন, আপনি একটু বেশিই বলছেন। আমি কিন্তু ওকে নিজের সন্তানের মতোই দেখি।
-আপনার দুই সন্তানতো দুই পা তুলে চিপস-পপকর্ণ খেতে খেতে যাচ্ছে। নিজেও যাচ্ছেন সিটের ওপর পা তুলে। মেয়েটাকে দিয়েছেন এক টুকরো চিপস?
তিনি আবারও বললেন, আমি না কি বেশি বেশি বলছি। সঙ্গে তার চোখ রাঙানী। আরও বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ‍্য করলাম বাসের অন‍্য যাত্রীরা হিন্দি সিনেমার নিরব দর্শক হয়ে আছেন।”

যুক্তি-পাল্টা যুক্তি, বিস্তারিত….

ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপগুলোতে এটি অনেক আলোচিত হয়৷ অধ্যাপিকার পক্ষ হতেও ভিডিও আপলোড করা হয় যাতে দেখা যায় ওই কাজের মেয়েকে তিনি কোলে নিয়ে যাচ্ছেন৷ দুই পক্ষের কাছে একটি গণমাধ্যম জানতে চায় আরো বিস্তারিত।

অধ্যাপিকা নাসরীন সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তিনজন দুইটা সিটে বসি। পথের মধ্যে মেয়েটি আমাদের সঙ্গে বসেই আসে।ফেরিতে ওঠার মুহূর্তে প্রায় আধাঘণ্টা মতো বাসে অপেক্ষা করতে হয়। সে সময় মেয়েটি ও আমার ছোট ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে পাশের ফেরি চলাচল দেখে। পরবর্তীতে নদী পার হলে আবার দুজনেই আমার সঙ্গে বসে’।
তিনি বলেন, ‘কিছু দূর আসার পর রাস্তায় গাছ কাটছিল বলে একটু জ্যাম বাঁধে। জ্যামের সময়ও মেয়েটি দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে বাইরে দেখছিল। পড়ে যেতে পারে দেখে আমি তার হাত ধরে রাখি। এ ছাড়া দুই-এক জায়গায় আমার ছেলেও উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে দেখছিল আর মাঝে মাঝে মেয়েটিও। এ সময়ের মধ্যেই ঐ ব্যক্তি ছবিটি তুলেছে। ’

করোনা সিম্পটমের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মেয়েটির করোনার সিম্পটম ছিল এ কথা আমি কখনও বলিনি। তিনি মনগড়া কথা লিখেছেন। যদি করোনার সিম্পটম থাকত তবে পাব্লিক ট্রান্সপোর্টে করে তাকে কেন নিয়ে আসব? কেনই বা তাকে আমার পাশে ও কোলে বসিয়ে নিয়ে আসব?’

‘মেয়েটি আমার সঙ্গে তিন বছর আছে। আমাকে ফুফু বলে ডাকে। মাঝে মাঝে মা বলেও ডাকে। মেয়েটিকে আমি আমার নিজের মেয়ের মতো দেখি। তাকে আমি এত পথ দাঁড় করিয়ে কেমনে নিয়ে আসব! মেয়েটি কোনো অভিযোগ করেনি। তারপরও আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসা রটানো হচ্ছে। ’

‘আমার বড় ছেলে যশোর যাওয়ার কথা ছিল না। ফলে মেয়েটিসহ আমি তিনজনের জন্য সিট নিয়েছিলাম। কিন্তু আগের রাতে বড় ছেলে বায়না ধরে সেও যাবে। আমি ভাবলাম কাউন্টারে গিয়ে আরেকটা সিট নিয়ে নিব। কিন্তু কাউন্টার থেকে ওরা জানাল সিট হবে একেবারে পেছনের দিকে। তাই আমি আর সিট নিইনি, পেছনে মেয়েটি বা আমার ছেলেদের একজনকে একা ছাড়তে চাইনি বলে। আমার পাশে বসিয়েই তাকে নিয়ে যাই’।

মঞ্জুরুল আলম পান্নার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি পুরো পথই ওই শিশুকে সিটে বসানো ছাড়া নিতে দেখেছি। ওই শিশুকে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং কখনো কখনো বাসের মেঝেতে ওই শিক্ষকের পায়ের সামনে যে খালি জায়গাটা রয়েছে তাতে বসতেও দেখেছি। তবে তাকে সিটে বসানো হয়নি। এটা সহ্য করতে না পেরে আমি প্রতিবাদ করি। পুলিশের সহযোগিতাও চেয়েছিলাম, হটলাইনে যোগাযোগ করলে সহযোগিতা করা হলেও স্থানীয় কন্ট্রোল রুম আশাব্যঞ্জক সহযোগিতা করেনি।

‘ওই বাসে ওইদিন মাঝের দিকেও সিট ফাঁকা ছিল। চাইলে কাউন্টারে এসেও আরেকটা সিট তিনি কাটতে পারতেন। এ ব্যাপারে বাস কাউন্টারে যোগাযোগ করলেই বিষয়টা জানা যাবে’।

অধ্যাপক নাসরীন সুলতানাও ফেইসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করেন যেখানে দেখা যায় যাত্রাপথে মেয়েটি জানালার পাশের সিটে তার সঙ্গে বসেই ভ্রমণ করছেন।

এ ব্যাপারে পান্না বলেন, ‘এটা তো বুঝাই যাচ্ছে যে এটা পরে ইচ্ছা করে করা ভিডিও। যারা যশোর অঞ্চলের তাদের কাছে বাসের বাইরের দৃশ‍্যগুলো খুবই পরিচিত। এমন যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে দেবেন, ওই ভিডিও কোন এলাকার কাছাকাছি করা। যেহেতু তিনি যশোর নামবেন এবং আমার সরাসরি প্রতিবাদটাও ছিল মাগুরা পার হওয়ার পর’।

মঞ্জুরুল আলম পান্না মনে করছেন তার সঙ্গে বাগবিগণ্ডা হওয়ার পরই ভিডিওটি সাজিয়ে ধারণ করেন ওই শিক্ষক।

Facebook Comments

Related Articles