সকালে কর্মীর আত্মহত্যা, রাতে শীর্ষ নেতার সৌজন্যে ভূরিভোজ

অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করেছেন ছাত্রলীগের এক কর্মী, খবরটি পেয়ে সংগঠনের শীর্ষ দুই নেতা বা কেন্দ্রীয় কোন নেতাই ঘটনাস্থলে যাননি। বরং সেদিন রাতেই একঝাক উৎফুল্ল হাস্যোজ্জ্বল নেতাকর্মীর ছবি দেখা যায়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন ইউনিটের একঝাক পদপ্রার্থীদের নিয়ে ভূরিভোজ করেছেন স্টার কাবাব এন্ড রেস্টুরেন্টের কাচ্চি দিয়ে। আর এরপরেই এই ছবি। তারা আদৌ খবরটা জানেন কিনা বা জানলেও কোন গুরুত্ব আছে কিনা সেটা হয়ত বুঝে গেছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরাই।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সহ সভাপতি আরিফ হোসেনের স্ট্যাটাসের মতই বলতে হয়, “সকালে আত্মহত্যা, রাতে ভূরিভোজ/ দিন দিন আমরা যেন আবেগহীন আর অনুভূতিশূণ্য হয়ে যাচ্ছি।”

একই রকম ক্ষোভ ছিল ছাত্রলীগের অন্যান্য নেতাকর্মীদের স্ট্যাটাসগুলোতেও। “যদি আমি মামুনের মতো আর্থিক অনটনের স্ট্যাটাস দিয়ে মারা যাই, তাহলে জানতেই পারবো না আমাকে নিয়ে কি আলোচনা হবে,তবে একটা জিনিস বুঝলাম অন্তত একটা দল আনন্দে রাতে ভুরিভোজ করবে।” “আপনারা ভুরিভোজ করেন আর যাই করেন,মামুন ছেলেটার জন্য একটা মিলাদের আয়োজন করেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদককে দৃষ্টি আকর্ষন করছি।”

আর্থিক সংকটে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ার বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন নেত্রকোনার কমলাকান্দার এক ছাত্রলীগ কর্মী আল মামুন। আল মামুন কলমাকান্দা সরকারি ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ।

রোববার (২৫ অক্টোবর) তার নিজ বাসা থেকে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ।

মৃত্যুর আগে আল মামুন তার ফেসবুকে লিখে গেছেন- “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপা, সভাপতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ- আমি আপনার রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কলমাকান্দা উপজেলা শাখার একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ, সৎ সাহস ও বুকে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে দেশ ও সমাজকল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি সবসময়। কখনও নিজের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের কথা চিন্তা করিনি।

এমতাবস্থায় ব্যাপক আর্থিক সংকট ও পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্ব নেয়া পাহাড় সমতুল্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যদি দয়া করে আমার পরিবারকে আর্থিক সাহায্য প্রদান করতেন- তাহলে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আমার পরিবারের এত কষ্টে দিন কাটত না, কিছুটা হলেও সুখের সন্ধান পেত।”

এ ঘটনাটি ছাত্রলীগের সাধারণ নেতাকর্মী ছাড়াও ছুয়ে গেছে সাধারণ মানুষদের এবং গণমাধ্যমেও বেশ আলোচিত হয়৷ একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে যুক্ত হয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেছেন তারা এ ব্যাপারে অবগত আছেন। একই দিন সাধারণ সম্পাদক ‘কাচ্চি পার্টি’ না করে নেত্রকোনা যেতে পারতেন কিনা এ প্রশ্ন উঠছে কর্মীদের মাঝেই৷ নিদেনপক্ষে শীর্ষ নেতার আচরণে একটুকু শোক পালন না করার মধ্য দিয়ে সংগঠনের ভাতৃত্ববোধটা নষ্ট হচ্ছে কিনা বলতে শুরু করেছেন অনেকেই।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল সংসদের ভিপির মৃত্যুর পরে সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন অনেকেই। ২০১৩-১৪ সেশনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, ঢাবির জিয়া হল সংসদের ভিপি শাকিল গত ২৮ আগস্ট গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিল। টাকার অভাবে স্কয়ার হাসপাতাল ত্যাগ করে তাকে অন্য হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। এরপর তিনি মৃত্যু বরণ করেন। নেতাকর্মীদের দুঃসময়ে সংগঠনকে কাছে না পেয়ে হতাশা ব্যক্ত করছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

Facebook Comments

Related Articles