করোনার ঊর্ধগমনের মধ্যেই ৫ লাখ বিসিএস পরীক্ষার্থী দেশজুড়ে ছোটাছুটি করবেন

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ( বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার ৮টা পর্যন্ত) করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ৬১৯ জন শনাক্ত হয়েছেন। এ সংখ্যা এক মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর থেকে বেশি শনাক্ত ছিল গত ২০ জানুয়ারি, ৬৫৬ জন। এর আগের ২৪ ঘন্টার রিপোর্টে ১৬ হাজার ৪১৪টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে ৬১৪ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

গেল বছরের ডিসেম্বর থেকে সংক্রমণ কমতে শুরু করে। কমতে কমতে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ৪০০ এর নিচে নেমে গেলেও তা লাফ দিয়ে ৬০০ এর কোটা ধরে ফেলেছে। শীতকালে সেকেন্ড ওয়েভের যে আশঙ্কা ছিল তা এখন আবারো আতঙ্কের হাতছানি দিচ্ছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন হাসপাতালে বেড খালি নেই। পাশের দেশ সহ বিশ্বজুড়ে নতুন ধরনের করোনার তান্ডব। এরকম পরিস্থিতিতেই ৮-১০ লাখ লোক ছুটে বেড়াবে দেশের এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। এরা সবাই আসছে ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার্থী।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো সব বন্ধ। শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ও মেস ত্যাগ করতে হয়েছে এক বছর পূর্বে। ২০১৯ সালের এই ৪১ তম বিসিএস এর সার্কুলারে পরীক্ষার্থীরা যে পরীক্ষা কেন্দ্র নির্বাচন করেছিলেন, বৈশ্বিক মহামারীর কারনে সেই কেন্দ্রের জেলা অধিকাংশ শিক্ষার্থী ত্যাগ করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের নাইমা সুলতানা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। বিসিএস এর আবেদন করেছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কেন্দ্র নির্বাচন করেন। অথচ তিনি এখন অবস্থান করছেন নিজ বাড়ি ভোলায়। হল বন্ধ থাকায় সেখানে অবস্থানের সুযোগ নেই। নাইমাকে পরিবারের কেউকে নিয়ে পরীক্ষা দিতে আসতে হবে রাজশাহী। এসেও থাকা, টয়লেট সব মিলিয়ে পড়তে হবে চরম বিপাকে। আত্মীয় বা পরিচিতিরা বাসায় করোনায় সময়ে যাওয়াটা পছন্দ করেন না। রাজশাহীর আবাসিক হোটেলগুলোও হয়ত ভর্তি হয়ে যাবে পরীক্ষার্থী দিয়ে। নাইমার মতোন নারী শিক্ষার্থীরা হোটেলে উঠতে হয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। সাথে থাকা বয়স্ক অভিভাবককে নিয়ে কি বিপদেই না পড়বে নাইমা! রাজশাহী শহরের রাজশাহী মেডিকেল, রুয়েট সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থীদেরই পড়তে হবে চরম সংকটে। এটা কেবল একটি জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আসন্ন ভোগান্তি। এরকম ৬৪ জেলার লক্ষাধিক বয়স্ক অভিভাবক যাতায়াত করবেন পৌনে পাচ লাখ পরীক্ষার্থীর সাথে এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। মনে হতেই পারে, করোনা ৪১ তম বিসিএস এর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আক্রান্ত করবেনা। মনে হবেই বা না কেন? যে যুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ঈদের আগে খুলছেনা সরকার সেসব যুক্তি তো মিথ্যা প্রমাণিত করছেন পিএসসি।

বিসিএস আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের আবাসিক শিক্ষার্থ (অনার্স পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগেই যেহেতু আবেদন করা যায়)। যাদের হলের বৈধতা নেই তারা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে বাসা ভাড়া করে থাকেন এবং বিসিএস এর প্রস্তুতির পাশাপাশি টিউশনি করে চলেন৷ করোনার কারনে হলের শিক্ষার্থী বাড়িতে, আর যে মেসে থাকত সেও টিউশনি হারিয়ে মেস ছেড়ে বাড়িতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি খোলার আগ পর্যন্ত বিসিএস নেওয়াটা কতোটা যৌক্তিক আর কতটা মানবিক সেটা পিএসসিকে আরেকবার ভাবার অনুরোধ জানাই।

দুইমাস পরে ভ্যাক্সিনেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে তেমন কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। মনে রাখতে হবে এটা বৈশ্বিক মহামারী। পাশের দেশ ভারতে নতুন ধরনের করোনার তান্ডব চলছে। আমাদের দেশের স্থিতিশীল অবস্থা ৪১ তম বিসিএস পরীক্ষার্থীদের দেশজুড়ে চলাচলে মুহুর্তেই বিনষ্ট হতে পারে। নতুন ধরনের করোনা বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চলে আসলে সেটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে।

সংকটকে বুঝতে পেরে আমাদের প্রজ্ঞাবান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয় হল খোলার আগে টিকা বাধ্যতামূলক করার মতন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷ শিক্ষামন্ত্রী বুঝতে পেরেছেন যে হল খুলে দিতে শিক্ষার্থীদের একটা চাপের কারন বিসিএস। তাই তিনি বিসিএস পরীক্ষা হল খোলার আগে না নেওয়ার কথা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন। অথচ পিএসসি ১৯ মার্চ পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে।

৪২ তম বিসিএস নেওয়াই হয়েছে সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগের জন্য। ৪২ তম বিসিএস এর পরীক্ষার্থী মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের হলও খোলা। পরীক্ষার্থী মাত্র ৩০ হাজার। এরপরেও স্বাস্থ্যবিধি মানার বাধ্যবাধকতার যে প্রতিচ্ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে তাতে আমরা।আঁতকে উঠেছি।

সর্বোপরি করোনা মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে সাফল্য সেটা ধরে রাখতে হবে। কোন ভুল সিদ্ধান্তের জন্য যেন এতদিনের সুনাম বিনষ্ট না হয় এরকমই কথা বলেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। করোনা ছড়ানোর জন্য গণপরিবহন সবচেয়ে উত্তম জায়গা। ৪১ তম বিসিএস পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জেনশুনে যেন বিপদে না ফেলা হয়।

পরীক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা এ মুহুর্তে শোচনীয়। বিভিন্ন জড়িপে এটা উঠে এসেছে। বৈশ্বিক মহামারীতে স্বজন হারানোর ট্রমা অনেকেই কাটাতে পারেননি। আশা করা যায়, এই ট্রমা কেটে যাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পরে। তাই বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সার্বিক দিক বিবেচনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পরপরই ৪১ তম বিসিএস পরীক্ষার্থীর তারিখ পুনঃনির্ধারণ করবেন বলে আমরা আশা করি।

Facebook Comments

Related Articles